Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে: সালিশে জরিমানা সাড়ে ৫ লাখ টাকা, গ্রামছাড়া যুবক

জেলা প্রতিনিধি

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

ডিভোর্সি এক নারীকে বিয়ে করায় শরীয়তপুরের জাজিরায় রতন সরদার নামে এক যুবককে সালিশে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা ও গ্রামছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে। সালিশকারীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। সালিশের পর থেকে প্রায় ৯ দিন ধরে বাড়িতে যেতে পারছেন না তিনি।

ঘটনাটি উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের মনাই ছৈয়াল কান্দি গ্রামের। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে জাজিরা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন রতন সরদার।

অভিযোগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই গ্রামের রুবেল শিকদারের সঙ্গে রতন সরদারের বন্ধুত্ব ছিল। পারিবারিক কলহের জেরে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর রুবেল তার স্ত্রী রুবিনা আক্তারকে তালাক দেন। পরে গত ৩ আগস্ট রুবিনাকে বিয়ে করেন রতন।

রতনের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই রুবেল শিকদার ও তার লোকজন তাকে পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে হেয় করার চেষ্টা করেন। এর জেরে গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মনাই ছৈয়াল কান্দি এলাকায় সাবেক ইউপি সদস্য মতিউর রহমান খানের বাড়ির উঠানে শতাধিক লোকজনের উপস্থিতিতে সালিশ বসে।

ভুক্তভোগীর দাবি, সালিশে তার বিরুদ্ধে পরকীয়াসহ কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপরও তাকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং সূর্য ওঠার আগেই গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সালিশে বসেই ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং জমি বন্ধক রাখার বাবদ আরও এক লাখ টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন রতন। বাকি ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা তিন কিস্তিতে প্রতি মাসের ২৫ তারিখের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। 

পাশাপাশি একটি সাদা কাগজে করা আপসনামায় ৫২ জন সাক্ষীর স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তার।

সালিশে উপস্থিতদের মধ্যে জাজিরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী আশরাফ মাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ বেপারী, বড়কান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাজ্জাক শেখ, সদস্য মতিউর রহমান খান, লতিফ খান, জাহাঙ্গীর শিকদার, রুবেল শিকদার ও সোহেল শিকদারসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন রতন।

সালিশে থাকা জাজিরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ বেপারী বলেন, পরকীয়ার প্রমাণসহ কোনো অপরাধ পাওয়া যায়নি। তারপরও অধিকাংশ সালিশকারীর সিদ্ধান্তে রতনকে জরিমানা ও গ্রামছাড়া করা হয়েছে। তার অপরাধ, সে একজন ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করেছে। আমি একা প্রতিবাদ করে কী করব! আমি বলেছিলাম, গ্রামের বিচারে সর্বোচ্চ জরিমানা তিন লাখ টাকা। তবে অন্য সালিশকারীদের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানি না।

বড়কান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাজ্জাক শেখ বলেন, সালিশে রতনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সে রুবিনাকে কীভাবে বিয়ে করেছে। রতন বলেছে, ‘তাকে ঝালমুড়ি খাইয়ে কীভাবে কী করেছে, সে জানে না।’ তাই আমরা মনে করেছি, আর সাক্ষী লাগে না। পরে জুরি ভোটে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রতন মাফ চাওয়ায় ৫০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। এরপর তাকে গ্রামছাড়া করা হয়।

তবে রুবেল শিকদার দাবি করেন, তার স্ত্রী রুবিনার সঙ্গে পরকীয়ার কারণে তার সংসার ভেঙে গেছে। পরে তার ডিভোর্সি স্ত্রীকে রতন বিয়ে করেছেন। এতে তিনি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করেন রুবেল।

রতনের প্রথম স্ত্রী হোসনে আরা বেগম বলেন, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে তার সম্মতি ছিল। এ বিয়ে নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। তার স্বামীর কোনো অপরাধ না থাকলেও কয়েকজন মিলে তাকে জরিমানা ও বাড়িছাড়া করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। স্বামীকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার বিচার দাবি করেন হোসনে আরা।

রতন সরদার বলেন, রুবিনার সঙ্গে রুবেল শিকদারের ডিভোর্স হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। আমি গত মাসে তাকে বিয়ে করেছি। তাহলে আমি কী অপরাধ করেছি? প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। এরপরও আমার ওপর জুলুম করা হয়েছে। ৯ দিন ধরে বাড়িতে যেতে পারছি না। আমাকে এলাকা ছাড়া করে দিয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।

জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ বলেন, রতন সরদার এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগটি তদন্তের জন্য এসআই হেমায়েতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিনিধি/এলএ