জেলা প্রতিনিধি
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০২ এএম
কোলাহল, দুরন্তপনা আর স্কুলে যাওয়ার বয়স ১১ বছরের তানিয়ার। অথচ এই বয়সে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে কাতরাচ্ছে শিশুটি। শরীরজুড়ে আঘাত ও পোড়ার চিহ্ন, মাথায় একাধিক সেলাই, পিঠে গভীর ক্ষত। দীর্ঘদিনের অপুষ্টিতে হাড্ডিসার শরীর। দুই পায়েও পচন ধরেছে।
তানিয়ার চোখে এখন আর শৈশবের স্বপ্ন নেই। আছে কেবল যন্ত্রণা আর নিজের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বিচার পাওয়ার আকুতি।
অভাবের সংসারে বাবার বোঝা কিছুটা কমবে এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ ভালো হবে—এই আশায় প্রায় দেড় বছর আগে সাড়ে নয় বছর বয়সে তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন দিনমজুর বাবা বেলাল হোসেন। কিন্তু সেই আশার পথ ধরে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া মেয়েটি ফিরে এসেছে ক্ষত-বিক্ষত ও পোড়া শরীর নিয়ে।
তানিয়াদের বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের করল্যাছড়ি গ্রামে। প্রায় পাঁচ বছর আগে তার মা মারা যান। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়ে বেলালের সংসারে অভাব আরও বেড়ে যায়। তখন স্থানীয় একটি মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত তানিয়া।

একপর্যায়ে প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠাতে রাজি হন বেলাল। তবে মেয়েকে ঢাকার কোন ঠিকানায় বা কার কাছে নেওয়া হচ্ছে, তা জানতেন না তিনি। প্রথমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের বড় মসজিদ-সংলগ্ন একটি বাসায় এক নারীর কাছে তানিয়াকে রাখা হয়। পরে ওই নারী তাঁকে ঢাকায় তাঁর বোনের বাসায় পাঠান।
তানিয়ার ভাষ্য, ঢাকার মিরপুরের একটি বাড়িতে তাকে রাখা হয়েছিল। বাড়ির গৃহকর্তার নাম রাসেল এবং গৃহকর্ত্রীর নাম ছোটন বলে জানিয়েছে সে। রাসেলের মিরপুরে ল্যাপটপের দোকান এবং তার স্ত্রী একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন বলেও জানায় শিশুটি।
তানিয়ার অভিযোগ, ওই বাড়িতে তার দিন কাটত ভয় ও নির্যাতনের মধ্যে। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুন্তি দিয়ে আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই তার ওপর এমন নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ তানিয়ার।
দেড় বছর ধরে মেয়েটি কীভাবে দিন কাটিয়েছে, তার খবর জানতেন না বাবা বেলাল। ঢাকায় যাওয়ার পর একবারও মেয়ের সঙ্গে তাকে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
কয়েক দিন আগে মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত করার পর তানিয়াকে ঢাকা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে শুক্রবার রাত তিনটার দিকে সেখান থেকে তাকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন বাবা বেলাল। হাসপাতালের বিছানাও জোটেনি শিশুটির। মেঝেতেই চলছে তার চিকিৎসা।

তানিয়ার শরীরে তাকালে বোঝা যায়, কতটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়া ও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মাথায় সেলাই, পিঠে বড় ক্ষত। দুই পায়েও পচন ধরেছে। দীর্ঘদিনের অপুষ্টিতে শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকাও তার পক্ষে সম্ভব নয়।
হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে তানিয়ার এখন একটাই আকুতি—নিজের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বিচার। আর বাবা বেলালের চাওয়া, মেয়েটি যেন বেঁচে থাকে এবং উন্নত চিকিৎসা পায়।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে শিশুটির ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তাকে বাঁচাতে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। খাগড়াছড়ি সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিসবাহ উদ্দিন জানান, ঘটনাটি ঢাকায় ঘটেছে। তাই খাগড়াছড়ি সদর থানায় মামলা নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রতিনিধি/এসএস