জেলা প্রতিনিধি
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে বহুতল এই হাসপাতালের লিফটগুলো নিয়মিত বিকল ও অচল হয়ে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনদের।
নতুন ভবনটি আটতলা এবং পুরোনো ভবনগুলো চারতলা। ফলে ওপরের তলার ওয়ার্ডগুলোতে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের ওঠানামায় অবর্ণনীয় কষ্ট পোহাতে হচ্ছে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন তলার ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও প্যাথলজি বিভাগে রোগীদের যাতায়াতের জন্য বহুতল ভবনগুলোতে ১৫টি লিফট রয়েছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে লিফটগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে থাকে।

৫–৬টি লিফট চালু থাকায় অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ে চাপাচাপি করে ওঠানামা করতে গিয়ে পকেটমার, চুরি, ঘাম, বাগ্বিতণ্ডা, ধাক্কাধাক্কি ও সময় অপচয়সহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। ট্রলি নিয়ে রোগী ওঠানামার প্রয়োজন হলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
কোনো কোনো ভবনের লিফট সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ থাকে। আবার যেগুলো চালু থাকে, সেগুলোতেও থাকে যান্ত্রিক ত্রুটি। কর্তৃপক্ষের হিসাবে ১২টি লিফট সচল থাকলেও সরেজমিনে দেখা যায়, রোগীদের জন্য নতুন ভবনে দুটি এবং পুরোনো ভবনে প্রতি ভবনে একটি করে লিফট চালু রয়েছে। নতুন ভবনে চিকিৎসক ও স্টাফদের জন্য পৃথক একটি লিফট চালু থাকে। এ ছাড়া বহির্বিভাগে দুটি লিফট চালু থাকলেও সেগুলো দিয়ে সর্বোচ্চ তৃতীয় তলা পর্যন্ত ওঠা যায়। অন্যান্য লিফট বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মমেক হাসপাতালের লিফটগুলো ইজারা নিয়ে ‘নাঈমা এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে লিফটগুলো প্রায়ই বিকল হচ্ছে। আবার বিকল লিফট মেরামতেও সময়ক্ষেপণ করা হয়। লিফট চলাকালীন দায়িত্ব পালনে অপারেটরদের অবহেলার অভিযোগও রয়েছে।
এসব লিফটে বিদ্যুৎ চলে গেলে পৃথক জেনারেটর বা ব্যাকআপ সুবিধা না থাকায় রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হয় বলে অভিযোগ। এসব অভিযোগের বিষয়ে নাঈমা এন্টারপ্রাইজের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

লিফট বিকল হলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন মুমূর্ষু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী ও শারীরিকভাবে অক্ষম রোগীরা। স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ারে থাকা রোগীদের ওপরের তলার ওয়ার্ডে নিতে লিফটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বাধ্য হয়ে অনেক সময় স্বজনেরা ঝুঁকি নিয়ে মুমূর্ষু রোগীকে কোলে তুলে বা সিঁড়ি দিয়ে ওপরের তলায় নিয়ে যান।
হাসপাতালের লিফটগুলোর সামনে প্রতিদিন সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ একসঙ্গে ওঠার চেষ্টা করায় সচল লিফটগুলোতেও চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এর সঙ্গে লিফট অপারেটরদের দায়িত্বহীনতা ও অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ তুলেছেন অনেক ভুক্তভোগী। একাধিকবার সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।

হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত তদারকি ও সার্ভিসিংয়ের অভাবের পাশাপাশি পুরোনো যন্ত্রাংশ এবং গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) ধীরগতির রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার কারণেও এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। কোনো লিফট নষ্ট হলে তা মেরামতের জন্য বাজেট অনুমোদন ও টেকনিশিয়ান আসতে কয়েক দিন সময় লাগে। এর চরম মাশুল দিতে হয় রোগী ও স্বজনদের।
সুজন ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, ‘একটি বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে লিফট বিকল থাকার ঘটনা সাধারণ কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার চরম উদাসীনতার প্রকাশ।’ অনতিবিলম্বে নষ্ট লিফটগুলো স্থায়ীভাবে মেরামত, নতুন লিফট সংযোজন এবং নিয়মিত কারিগরি তদারকি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘লিফটে ত্রুটি থাকায় সবাইকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। চিকিৎসক ও নার্সদেরও প্রায় সময় পায়ে হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে হয়। ইজারাদার প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগাদা দিলেও তাদের দায়সারা ভূমিকার কারণে সবাইকে কষ্ট করতে হচ্ছে।’
গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, শিগগিরই তিনি হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবেন এবং বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
প্রতিনিধি/এসএস