অব্যাহত বালু উত্তোলন, সাগরলতা ও ঝাউগাছ নিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পর্যটন অবকাঠামোর চাপ-সব মিলিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। স্থানীয়দের দাবি, গত পাঁচ বছরে সৈকতের অন্তত ৫০০ ফুট বালুচর সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে জিওব্যাগ ফেলা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না। বরং অনেক স্থানে জিওব্যাগ ছিঁড়ে ও সরে গিয়ে কিংবা এর নিচ থেকে বালু সরে ভাঙন আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে তীব্র ভাঙনের চিহ্ন। কোথাও সৈকতের পাড় কয়েক ফুট নিচে নেমে গেছে, কোথাও জিওব্যাগের নিচ থেকে বালু সরে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। ঢেউয়ের আঘাতে কোনো কোনো স্থানে জিওব্যাগ ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সৈকতে।
এতে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের চলাচলেও অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। বালুচর ও প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ায় হুমকিতে পড়েছে পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও পরিবেশ।
ঢাকার মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটক দম্পতি জেসমিন বোখারি ও শাহরুখ বোখারী বলেন, ‘সৈকতের পরিবেশ খুবই খারাপ হয়ে গেছে। পাড় ভাঙনের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এখানে যুদ্ধ হয়েছে। এসব মেরামতে সাময়িক ব্যবস্থা না নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে যাওয়া উচিত।’

স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও সৈকতের অনেক এলাকায় বিস্তীর্ণ বালুচর, সারি সারি ঝাউগাছ ও সাগরলতায় ঢাকা বালিয়াড়ি ছিল। এখন সেসব জায়গায় আছড়ে পড়ছে উত্তাল ঢেউ। বর্ষা এলেই ভাঙন তীব্র হচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ ফেলা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
পর্যটন ব্যবসায়ী শাহেদ সেলিম বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়। সাগর থেকে বালু উত্তোলন, সাগরলতা ও ঝাউগাছ কর্তনের কারণে সৈকত তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সমুদ্রের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে হস্তক্ষেপ, সৈকত দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নগরায়ণের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তাদের চোখের সামনেই গত কয়েক বছরে অন্তত ৫০০ ফুট বালুচর সাগরে বিলীন হয়েছে। বছরের পর বছর জিওব্যাগ ফেলা হলেও থামানো যাচ্ছে না সাগরের আগ্রাসন।
একেকটি ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে, আর বদলে যাচ্ছে সৈকতের চেনা চেহারা। উত্তাল সাগরের আঘাতে কোথাও কয়েক ফুট, আবার কোথাও আরও বেশি জায়গা চলে যাচ্ছে সাগরের গর্ভে। অথচ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই বালিয়াড়িই ছিল ঢেউয়ের বিরুদ্ধে সৈকতের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

এখন সেই বালিয়াড়ির জায়গায় বসানো হয়েছে জিওব্যাগ। কিন্তু ঢেউয়ের আঘাতে সেগুলোও দীর্ঘদিন টিকছে না। কোথাও বস্তা ছিঁড়ে গেছে, কোথাও সরে গেছে জায়গা থেকে। আবার কোনো কোনো স্থানে জিওব্যাগের নিচ থেকে বালু সরে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বারবার জিওব্যাগ ফেলেই কি আদৌ সৈকতের ভাঙন ঠেকানো সম্ভব?
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা ধরা কক্সবাজারের যুগ্ম আহ্বায়ক এইচএম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, বালু উত্তোলন ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত স্থানে জিওব্যাগ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু জিওব্যাগ কোনো কাজে আসছে না। এর কারণে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও ফুটে উঠছে না। প্রতিবছর জিওব্যাগের পেছনে যে টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, মনে হয় সেই ব্যয় পুরোটাই পানিতে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বালু রক্ষার নামে জিওব্যাগ দেওয়া হয়েছিল। আসলে জিওব্যাগ দেওয়ার ফলে আরও ভাঙন বেড়েছে। জোয়ারের পানি বস্তায় আঘাত করছে, বস্তা সরে যাচ্ছে। ফলে তীরে ভাঙন তীব্র হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নয়, অপরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ধ্বংসও সৈকত ভাঙনের অন্যতম কারণ। জিওব্যাগ সাময়িকভাবে ঢেউয়ের আঘাত ঠেকাতে পারে, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধার ও সৈকতের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জরুরি।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ ফোরামের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন, বালিয়াড়ি ও উদ্ভিদ ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর মতে, জিওব্যাগের মতো সাময়িক ব্যবস্থার পাশাপাশি দ্রুত প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধার, সাগরলতা ও ঝাউগাছ সংরক্ষণ এবং সৈকতের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
সমুদ্রবিজ্ঞানী আবদুল কাইয়ুম বলেন, অন্য জায়গা থেকে বালি এনে এখানে ভরাট করা যায়। এরপর প্রাকৃতিকভাবে নিশি, কেয়া ও আইপোমিয়া সাগরলতা এনে সেখানে লাগানো যায়। এভাবে জায়গাটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা পর্যটন করপোরেশন করতে পারে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দুই বছর আগে সৈকতের ভাঙন রোধে কাজ করতে গিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। যার কারণে বর্তমানে সেখানে আমাদের কোনো কাজ নেই।’
তবে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। তিনি বলেন, ‘কোন কোন জায়গায় ভাঙন রোধ করা প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করে সরকারের কাছে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলমান আছে। আমরা আশা করছি, সরকারি বরাদ্দ পেলে প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘টেম্পোরারি বেসিসে প্রতি বছর যে কিছু বরাদ্দ থাকে, সেই ফান্ডের মাধ্যমে যেখানে অতি জরুরি প্রয়োজন, সেখানে বালি, জিওব্যাগ বা এ ধরনের উপকরণ দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
প্রতিনিধি/এসএস




