জেলা প্রতিনিধি
৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫০ এএম
ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা পরিচয় গোপন রেখে জানানোর সুযোগ তৈরি করেছে ‘ঘুষ ডট সাইট’। ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদের উদ্যোগে তৈরি এই ওয়েবসাইট চালুর পর ব্যাপক সাড়া মিলেছে। চালুর মাত্র নয় দিনের মধ্যে সেখানে জমা পড়েছে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে দাবি করা ঘুষের মোট পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা।
ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আমিনা খাতুনের ছেলে শাহেদ শরীফ আহমেদ। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান আমিনা। তখন তার চাকরির বয়স হয়েছিল ১৩ বছর।
মায়ের মৃত্যুর পর তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় সাত লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল পরিবারের। কিন্তু টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক দফতরে ঘুষের দাবির মুখে পড়তে হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে আট হাজার টাকা—সব মিলিয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতেই ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। এরপর কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ টাকা ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আট লাখ টাকা পেতে শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করছেন বলে অভিযোগ তাদের। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে শাহেদ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছে সে। পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট শেখার আগ্রহ থেকেই কোডিংয়ের সঙ্গে পরিচয়। তবে ‘ঘুষ ডট সাইট’ তৈরির পেছনে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাও কাজ করেছে।
শাহেদ শরীফ আহমেদ বলেন, “আম্মুর পেনশনের ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গেলে ফাইল আটকে রেখে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যেই কাজ হয়ে যায়। এই ক্ষোভ থেকেই ওয়েবসাইটটি বানাই।”
একটি ভারতীয় ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শাহেদ মাত্র দুই ঘণ্টায় ‘ঘুষ ডট সাইট’-এর প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেন। পরে বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয়। ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ ডলার।
শুরুতে শাহেদের ধারণা ছিল, এটি হয়তো তার সিভিতে যুক্ত করার মতো একটি প্রকল্প হয়ে থাকবে। কিন্তু ওয়েবসাইট চালুর নয় দিনের মধ্যেই সেখানে জমা পড়ে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে দাবি করা ঘুষের মোট পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা। অভিযোগের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বর্তমানে চার সদস্যের একটি পর্যালোচনা দল সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করছে। ড্যাশবোর্ডে ফিল্টারের পর অভিযোগগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে।
‘ঘুষ ডট সাইট’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, অভিযোগ জানাতে গিয়ে কোনো ভুক্তভোগী যেন নতুন করে আইনি বা ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে না পড়েন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শাহেদ বলেন, “এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ কোনো হুমকি পাইনি। শুরুতে সাইটটি এত ভাইরাল হবে, তা ভাবিনি। ভেবেছিলাম সিভিতে যুক্ত করব। বর্তমানে আইনি ঝুঁকি এড়াতে ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় বা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে লিগ্যাল টিম গঠন বা সরকারি সমর্থন পেলে পূর্ণ তথ্য যুক্ত করা হবে।”
সে আরও বলে, “আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারের টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা সবাইকে জানানো। সোজা কথায়, ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনা, যেন সাধারণ মানুষ সেবা পেতে কোনো বাধার মুখে না পড়ে।”
শাহেদের উদ্যোগে সবচেয়ে বড় সমর্থন এসেছে তার বাবা শরিফুল ইসলাম শামীমের কাছ থেকে। তিনি আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। স্ত্রী আমিনা খাতুনের মৃত্যুর পর সরকারি প্রাপ্য টাকা তুলতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তা এখনো তাকে কষ্ট দেয়।
শরিফুল ইসলাম শামীম বলেন, “স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষের মুখে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলেছি। কিন্তু বাকি ১০ লাখ টাকা পেতেও এক লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস মিলে টাকা না দিলে কাজ হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি জেদ ধরেছি, ঘুষ না দিয়েই টাকা তুলব। ছেলের এই উদ্যোগে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মো. মজিবুর রহমান ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “কেউ আমার কাছে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি। কাগজ নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে দিই।”
৩০ আগস্ট সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন বলেন, “ঘুষ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা আমাকে কিছু জানাননি। কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।” একই সঙ্গে তিনি বকেয়া টাকা দ্রুত মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
টিআইবি ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, “ঘুষের কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পদে পদে ছড়িয়ে পড়া ঘুষের চিত্র এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সরকার যদি প্রযুক্তিনির্ভর এই স্বচ্ছতার পদক্ষেপগুলো কাজে লাগায়, তবে সাধারণ মানুষ চরমভাবে উপকৃত হবে।”
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “তরুণদের এই উদ্যোগ আমাদের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য এলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আইনি পদক্ষেপ নেবে।”
প্রতিনিধি/এসএস