৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম
সময় বদলেছে। কৃষকের হাতে এসেছে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরসহ নানা আধুনিক যন্ত্র। কম সময়ে বেশি জমি চাষ করা যায় এসব যন্ত্র দিয়ে। তবুও নুরুজ্জামান সরদারের হাতে এখনো রয়ে গেছে কাঠের লাঙল আর গরুর হাল। তার বাড়ি গাইবান্ধার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামে। এ গ্রামের মৃত বনিজ উদ্দিন সরদারের ছেলে তিনি।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, নুরুজ্জামান সরদার (৬৫) প্রায় তিন যুগ ধরে গরুর হাল বিক্রি করে আসছেন তিনি। একসময় এই হাল ছিল কৃষকের চাষাবাদের অন্যতম প্রধান উপকরণ। এখন যন্ত্রের দাপটে এর ব্যবহার অনেকটাই কমেছে। তবুও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আর সেই চাহিদাকে আঁকড়ে ধরেই চলছে নুরুজ্জামানের ব্যবসা।
নুরুজ্জামান বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি গরুর হাল ও কৃষিকাজের সঙ্গে পরিচিত। আগে গ্রামের প্রায় প্রতিটি কৃষকই জমি চাষে গরুর হাল ব্যবহার করতেন। তখন লাঙল, জোয়াল ও হালের চাহিদা ছিল অনেক বেশি। প্রতিদিনই ক্রেতা আসত।
আগে হালের ব্যবসা ভালোই চলত। একেকদিন কয়েকটা হাল বিক্রি হতো। এখন মেশিনের কারণে সেই চাহিদা নেই। তারপরও কিছু কৃষক গরুর হাল খোঁজেন। তাদের জন্যই কাজটা ধরে রেখেছি বলেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় গরুর হাল শুধু কৃষকের প্রয়োজনই মেটাত না, এটি ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভোরে গরুর গলায় ঘণ্টার শব্দ, জমিতে লাঙল চালানোর দৃশ্য আর কৃষকের হাঁকডাক- সব মিলিয়ে তৈরি হতো বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ আবহ। কিন্তু আধুনিক কৃষি সেই চিত্র অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তবে গরুর হালের আলাদা একটি জায়গা এখনো আছে। ছোট জমি, বাড়ির আশপাশের জমি কিংবা যেসব জায়গায় বড় যন্ত্র ঢুকতে পারে না—সেসব স্থানে এখনো গরুর হাল কাজে লাগে। অনেক কৃষক আবার ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতেই চাষ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
করিম উদ্দিন (৬০) নামের একজন কৃষক বলেন, মেশিনে দ্রুত জমি চাষ করা যায় ঠিকই, কিন্তু সব জায়গায় মেশিন নেওয়া যায় না। তখন গরুর হালই ভরসা। তাই প্রয়োজন হলে নুরুজ্জামানের কাছ থেকে হাল কিনি। তার এই ব্যবসা শুধু আয়-রোজগারের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার জীবনের দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি।
আরও পড়ুন: ঘোড়া দিয়ে হাল চাষ করেন দিনাজপুরের মহসীন
সাদেব আলী (৭৫) নামের এক বৃদ্ধ বলেন, তিন দশক ধরে নুরুজ্জামানের কাঠের সঙ্গে সখ্যতা। হাতের নিপুণতায় তৈরি করেছেন অসংখ্য লাঙল, জোয়াল ও হালের সরঞ্জাম। সময়ের সঙ্গে ক্রেতা কমেছে, ব্যবসার পরিধি ছোট হয়েছে- তবুও কাজটি ছাড়েননি তিনি।
নুরুজ্জামান বলেন, ‘সবকিছু তো আর মেশিন দিয়ে হয় না। আমাদের পুরোনো জিনিসগুলোরও দরকার আছে। যতদিন মানুষ চাইবে, ততদিন আমি হাল বিক্রি করে যাব।’
গ্রামের প্রবীণদের অনেকেই মনে করেন, গরুর হাল শুধু একটি কৃষি যন্ত্র নয়; এটি গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যেরও অংশ। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় হয়তো এর ব্যবহার কমে আসছে, কিন্তু মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতিতে এর অবস্থান এখনো শক্ত। যন্ত্রের যুগে কৃষি যখন দ্রুত আধুনিক হচ্ছে, তখনও নুরুজ্জামানের হাতে ঘুরছে কাঠের লাঙল। গরুর গলায় বাঁধা দড়ি ধরে এগিয়ে চলেছে তার জীবিকার চাকা।
আরও পড়ুন: হারিয়ে যাচ্ছে লাঙ্গল গরুর হাল চাষ!
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমানে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়েছে। এতে কম সময়ে বেশি জমি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে এবং শ্রম ও উৎপাদন খরচও কমছে। তবে গরুর হাল আমাদের গ্রামীণ কৃষির একটি ঐতিহ্য। ছোট ও বিচ্ছিন্ন জমি কিংবা বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এখনো গরুর হালের ব্যবহার দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, নুরুজ্জামানের মতো কৃষকেরা দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। কৃষির আধুনিকায়নের পাশাপাশি আমাদের গ্রামীণ কৃষি সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
প্রতিনিধি/এমআই