জেলা প্রতিনিধি
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৩ এএম
দেশের সর্ব উত্তরের সীমান্তবর্তী ও পর্যটন সম্ভাবনাময় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ইউএনওসহ অন্তত ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে নেই কর্মকর্তা ও পর্যাপ্ত জনবল। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীর তীব্র সংকটে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা। কোনো দপ্তরে শীর্ষ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য, কোথাও আবার একাধিক পদ খালি। কয়েকটি দপ্তর আবার জোড়াতালি দিয়ে চলছে অতিরিক্ত ও ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের ওপর ভর করে। এতে সেবাগ্রহীতাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদটি গত ৬ জুলাই থেকে শূন্য রয়েছে। প্রথমে সদর উপজেলার ইউএনও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস. এম. আকাশ ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া এ দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে নেই কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদটি শূন্য। জুনিয়র কনসালটেন্টের ১০টি পদের মধ্যে ৯টি, মেডিকেল অফিসারের ২৮টির মধ্যে ১৭টি, মিডওয়াইফের ২টি এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ১৯টি পদের মধ্যে ৮টি পদই শূন্য রয়েছে।
মহিলা বিষয়ক দপ্তরে কর্মকর্তা তো নেই-ই, নেই কোনো স্থায়ী কর্মচারীও। ২০২১ সাল থেকে পার্শ্ববর্তী আটোয়ারী উপজেলার কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। জানা গেছে, তিনি সপ্তাহে এক-দুই দিন এসে অফিস পরিচালনা করেন। এতে মাতৃত্বকালীন ভাতা, ভিডব্লিউবি, প্রশিক্ষণ, বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে নেই স্থায়ী কর্মকর্তা। গত ৩০ জুলাই সমাজসেবা কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করার পর আর কোনো কর্মকর্তা যোগদান করেননি। উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও দীর্ঘদিন থেকে স্থায়ী কোনো সাব-রেজিস্ট্রার নেই। ফলে জমি কেনাবেচা ও দলিল সম্পাদনে সেবাগ্রহীতাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে সরকারি রাজস্ব আদায় কার্যক্রমও।
একই চিত্র উপজেলা কৃষি অফিসেও। এই অফিসে অতিরিক্ত কৃষি অফিসারের ১টি, সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসারের ২টি, উপ-সহকারী কৃষি অফিসারের ১০টি পদসহ মোট ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। উপজেলা এলজিইডি অফিসে সম্প্রতি প্রকৌশলীর পদটি পূরণ হলেও সহকারী প্রকৌশলীর ১টি, উপ-সহকারী প্রকৌশলীর ৩টির মধ্যে ২টি ও নকশাকারকের ১টি পদ খালি রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ২টি পদের মধ্যে ১টি শূন্য। পরিবার পরিকল্পনা অফিসে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদ দুটিও খালি। এছাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও নির্বাচন কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় দেওয়া হয়েছে ভারপ্রাপ্ত ও অতিরিক্ত দায়িত্ব। আনসার-ভিডিপি, পরিসংখ্যান ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারেও নেই কর্মকর্তা। খালি রয়েছে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন অফিসারের পদটিও। উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাও রয়েছেন অতিরিক্ত দায়িত্বে। একজন অডিটর দিয়ে চলছে অফিস, নেই কোনো জুনিয়র অডিটর এবং অন্য কোনো জনবলও। উপজেলার বাংলাবান্ধা, তিরনই ও দেবনগড় ইউনিয়নে নেই তহশিলদার বা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা; বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদে ইউপি সচিবের পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় পার্শ্ববর্তী উপজেলার কর্মকর্তাদের দিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব চালানো হচ্ছে, ফলে তারা সপ্তাহে মাত্র এক-আধ দিন সময় দিতে পারছেন। একদিকে, কর্মকর্তা সংকট, অন্যদিকে কর্মচারীর অভাবে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সমস্যাটি দীর্ঘদিনের হলেও সমাধানে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। এ সুযোগে কিছু অসাধু কর্মচারী নিজেদের দাপট ও প্রভাব খাটিয়ে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে, সেবাপ্রার্থীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন, নষ্ট হচ্ছে সময় ও অর্থ।

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নেওয়া লুবানা আক্তার নামে এক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, আমরা ৫৯ দিনের ভাতার স্বাক্ষর করলেও এখন অফিসের কর্মচারী অর্ধেক টাকা দিচ্ছে। সমস্যার কথা কাকে বলব? যিনি দায়িত্বে আছেন তাকে তো অফিসে গিয়ে পাই-ই না। তিনি নাকি তিনটি দপ্তরের দায়িত্বে আছেন।
আজিজনগর এলাকার বাসিন্দা শাহিনুর ইসলাম শাহীন বলেন, গোবরা নদীতে কিছু অসাধু ব্যক্তি বিষ প্রয়োগ করে মাছ মেরে ফেললে আমি মৎস্য অফিসে জানাই। উল্টো তারা বলেন যে, আসতে পারবেন না, এটি নাকি প্রশাসনের কাজ।
একই ক্ষোভ প্রকাশ করে নাইবুল ইসলাম নামে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এত বড় একটি উপজেলা কীভাবে ইউএনও ছাড়া চলে? যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের নাকি আর্থিক ক্ষমতা নেই। অন্যান্য দপ্তরেরও প্রধান নেই। দ্রুত শূন্য পদে স্থায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া হোক।
উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল মমিন বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের নানা দাপ্তরিক কাজে ইউএনও, সমাজসেবা ও মহিলা অধিদপ্তরে যেতে হয়। কিন্তু কর্মকর্তা না থাকায় খুব সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. শাকিল রহমান বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদটি সম্প্রতি শূন্য হয়েছে। চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকট রয়েছে। এর মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবরিনা আফরিন বলেন, অতিরিক্ত কৃষি অফিসার, উপ-সহকারী কৃষি অফিসারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য রয়েছে। আমরা সীমিত জনবল দিয়েই কৃষকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। শূন্য পদগুলোতে লোকবল পেলে সেবার মান আরও বাড়ানো সম্ভব হতো।
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশ বলেন, জনবল সংকটের কারণে বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সেবাগ্রহীতারা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকারা পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারায় দাপ্তরিক কাজের গতি কমে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোসা. শুকরিয়া পারভীন বলেন, তেঁতুলিয়ায় ইউএনও নেই বিষয়টি আমার জানা ছিল, তবে অন্যান্য দপ্তরে কর্মকর্তা নেই তা জানা ছিল না। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। পদায়ন বা পোস্টিং দেওয়ার এখতিয়ার ঊর্ধ্বতন দপ্তরের। যেসব দপ্তরে জনবল নেই, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আমি বিষয়টি দ্রুত জানাব।
প্রতিনিধি/টিবি