Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

৮ গুণ বড় হবে চট্টগ্রাম মহানগর, ২৫ বছরের খসড়া পরিকল্পনা চূড়ান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৪ এএম

চট্টগ্রাম মহানগরের বর্তমান আয়তন ১৫৫.৪ বর্গকিলোমিটার। আর সেই আয়তন বিস্তৃত হয়ে আট গুণ বড় হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগর। এর আওতায় আসছে নগরীর আশপাশের সীতাকুন্ড, হাটহাজারী, রাউজান, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলা। এতে চট্টগ্রাম মহানগরের আয়তন বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১,২৫৫ বর্গকিলোামিটারে।

২৫ বছর মেয়াদি একটি নতুন মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এমন তথ্য জানিয়েছেন সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।

বেলায়েত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান ২০২৫-২০৫০ এর আওতায় নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের সঙ্গে আশপাশের পৌরসভা, উপজেলা মিলিয়ে আগামী ২০৫০ সালের জনসংখ্যা এবং চাহিদা মাথায় রেখে ভবিষ্যৎ নগরায়ণের সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোকে সিডিএর আওতায় আনা হচ্ছে। ২৫ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে চট্টগ্রামকে অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের বদলে একটি আধুনিক, টেকসই ও সমন্বিত মহানগর হিসেবে গড়ে তোলা।

তিনি আরও বলেন, খসড়ার ওপর নাগরিকদের মতামত ও আপত্তি গ্রহণের জন্য গত ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিন সময় রাখা হয়েছে। যেকোনো নাগরিক এই মাস্টারপ্ল্যান সম্পর্কে নিজের মতামত জানাতে পারবেন। অনলাইনেও মতামত জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।

সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের এই উদ্যোগের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে নগরীর বর্তমান অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ। পাহাড় কাটা, জলাশয় ও খাল ভরাট, আবাসিক এলাকায় অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা, যানজট, জলাবদ্ধতা, আবাসন সংকট প্রভৃতি সমস্যা শুধু বর্তমান সিটি কর্পোরেশন এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নগরীর চারপাশে দ্রুত আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠায় ভবিষ্যৎ নগরায়ণকে এখনই পরিকল্পনার আওতায় আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

নতুন মহাপরিকল্পনায় তাই শুধু রাস্তা বা ভবন নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি। ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, আবাসন, পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা-সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। খসড়া পরিকল্পনায় ১৫টি খাতে ৭৭টি নীতিগত প্রস্তাব এবং ২৭৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের কথা রয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ১০১টি এবং ড্রেনেজ উন্নয়নে ২১টি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হচ্ছে নগরকেন্দ্রিক চাপ কমানো। এজন্য ওয়ান সিটি, টু টাউনস ধারণা সামনে আনা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়কে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের উন্নয়নকে নতুনভাবে সাজানোর পাশাপাশি আনোয়ারার জন্য পৃথক ডিটেইলড অ্যাকশন প্ল্যানের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাকলিয়া ও আগ্রাবাদ এলাকাকেও পৃথক পরিকল্পনার আওতায় আনার কথা রয়েছে।

সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, নগরীর ওপর সবকিছুর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এখন শহরের বাইরে সীতাকুন্ড কিংবা হাটহাজারীতে যদি পরিকল্পিতভাবে একটি স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তুলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বহু মানুষের নগরীতে আসার প্রয়োজন হবে না। আমরা নগরীর ওপর চাপ কমানোর জন্য কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।

খসড়া প্রস্তাবে যা আছে

সিডিএ সূত্র জানায়, বর্তমানে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক আয়তন ১৫৫.৪ বর্গকিলোমিটার। নতুন মাস্টার প্ল্যানের আওতায় সিটি কর্পোরেশনের বাইরের বিস্তৃত এলাকাকে ভবিষ্যৎ নগরায়ণ কিংবা স্যাটেলাইট সিটি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সিডিএ একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

পরিকল্পনায় নগরীর যানজট কমাতে নতুন বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এবং বিভিন্ন এলাকায় উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল নগরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে একাধিক কেন্দ্রভিত্তিক নগরায়ণ বা স্যাটেলাইট টাউন মডেল অনুসরণের কথা বলেন তিনি। এতে কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও নাগরিক সুবিধা নগরের কেন্দ্র থেকে বাইরের পরিকল্পিত এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা। নতুন মাস্টারপ্ল্যানে খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। শুধু খাল-নালা পরিষ্কার নয়, নগরায়ণের ধরন, জলাধার সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের বিষয়টিকেও পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে। পরিকল্পনা এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার পুকুর ও অন্যান্য জলাধার চিহ্নিত করে সেগুলো সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে।

পাহাড় ও জলাধার রক্ষায়ও কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। খসড়া পরিকল্পনায় নগরীর প্রায় ১৮ বর্গকিলোমিটার অক্ষত পাহাড় এবং পুরো পরিকল্পনা এলাকার প্রায় ১৮৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে। পাহাড়ি এলাকার ঢাল ৩০ শতাংশের বেশি হলে সেখানে নির্মাণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও রয়েছে। নগরীর পাহাড়গুলোকে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জন্য নতুন এই পরিকল্পনায় ভূমিকম্প ঝুঁকি বিবেচনায় ভূমি ব্যবস্থাপনা সংযোজন করা হয়েছে। খসড়া মাস্টারপ্ল্যানে চট্টগ্রামের প্রথম সয়েল লিকুইফ্যাকশন রিস্ক ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি এলাকা বাদ দিলে পরিকল্পনা এলাকার ৩০ শতাংশের বেশি জায়গা এই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভূমিকম্পের সময় পানিসিক্ত মাটি শক্তি হারিয়ে ফেললে বড় ধরনের অবকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ নগরায়ণে এ ধরনের ঝুঁকি বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনায় বড় আকারের উন্মুক্ত স্থান ও পার্ক তৈরির কথাও রয়েছে। জাতীয় উদ্যানের আদলে দুই থেকে তিনটি বড় পার্ক, জাতীয় কবরস্থানের আদলে একটি বড় কবরস্থানের জন্য জমি সংরক্ষণ এবং একটি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দ্রুত নগরায়ণের মধ্যেও খোলা জায়গা, সবুজ এলাকা ও জনসাধারণের বিনোদনের সুযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

CTG

ব্যয় ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা

সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে সিডিএ।

সূত্র মতে, চট্টগ্রামের জন্য ১,২৫৫ বর্গকিলোমিটারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু নগরীর আবাসন বা সড়ক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্পাঞ্চল, বন্দর, পর্যটন, কৃষিজমি, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, নদী-খাল, পাহাড় ও পরিবহন অবকাঠামো-সবকিছুর ভবিষ্যৎ বিন্যাস এর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

অর্থাৎ ১৫৫ বর্গকিলোমিটারের বর্তমান নগরকে ঘিরে আগামী ২৫ বছরের জন্য প্রায় আট গুণ বড় একটি মহানগর পরিকল্পনা এলাকা তৈরি করা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে উক্ত এলাকাগুলোতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করতে সিডিএ থেকে ডিজাইন এবং ড্রয়িং অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে।

উল্লেখ্য, সিডিএ ইতোপূর্বে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান ২০২০-২০৪১ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই প্রকল্পের আওতায় জরিপ ও পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ নেওয়া হয়েছিল। নতুন ২০২৫-২০৫০ পরিকল্পনা মূলত আগামী ২৫ বছরে নগরীর বিস্তার, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত চাহিদাকে সামনে রেখে আরও বিস্তৃত পরিসরে তৈরি করা হচ্ছে।

আইকে/এফএ