রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

গ্যাস সংকটের অজুহাতে চট্টগ্রামে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

গ্যাস সংকটের অজুহাতে চট্টগ্রামে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়
চট্টগ্রাম মহানগরে গ্যাসচালিত গণপরিবহনগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে
  • যাত্রীদের সাথে চালক-হেলপারের নিত্য ঝগড়া
  • যাত্রী, চালক-হেলপার সবার মাঝে ক্ষোভ
  • নির্বিকার সংশ্লিষ্ট প্রশাসন

গ্যাস সংকটের অজুহাতে চট্টগ্রাম মহানগরে গ্যাসচালিত গণপরিবহনগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নগরীর পথে পথে সাধারণ যাত্রীদের সাথে চালক-হেলপারের নিত্য ঝগড়া-বিবাদ লাগছে। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে নগরীর জনসাধারণের মনে।

যাত্রীদের মতে, চট্টগ্রামের গণপরিবহনগুলোতে যাতায়াতে যেখানে উঠানামায় ন্যূনতম ভাড়া ছিল ৫ টাকা, সেখানে ১০ টাকা করে আদায় করা হত অনেক আগে থেকেই। সেই স্থলে এখন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি বাড়া আদায় করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট দূরত্বের পর আদায় করা হচ্ছে আরও অতিরিক্ত ভাড়া।

যাত্রীদের প্রশ্ন গ্যাসচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে সরকারি বা প্রশাসনিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না? কিন্তু সেই উত্তর না দিয়ে চালক-হেলপারের পক্ষ থেকে ভাড়া বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে গ্যাস সংকট। তাতে মৌন সম্মতি পরিলক্ষিত হচ্ছে গণপরিবহন মালিক সংগঠনের লোকজনের কথায়ও। যদিও ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে তারা কিছুই জানে না বলে জানান।  

মালিক সংগঠনের লোকজনের মতে, দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে এমনিতেই তেলবাহী গণপরিবহনের তুলনায় গ্যাসচালিত গণপিরবহনে ভাড়া কম আদায় করা হচ্ছে। বর্তমানে গ্যাস সংকটের মধ্যে গণপরিবহনগুলোর আয় কমে গেছে। এ অবস্থায় যৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

চালক ও হেলপাররা জানান, চলতি মাসের শুরু থেকে চট্টগ্রামের পাম্প স্টেশনগুলোতে তীব্র গ্যাসের সংকট চলছে। গাড়িতে গ্যাস নিতে সকালে গেলে বিকেলেও নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাসচালিত বাস, মিনিবাস, টেম্পো, সিএনজি অটোরিক্সা ও প্রাইভেট কারের কয়েক কিলোমিটার লাইন নগরীর প্রতিটি পাম্প স্টেশনের এখন নিত্য দৃশ্যমান বিষয়। ফলে গণপরিবহনগুলোতে আয় রোজগার একেবারে কমে গেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চালক-হেলপাররাও।

চালক-হেলপাররা বলেন, আমাদের পরিবার-পরিজন আছে। তাদের খাবার জোগাড় করতে হয় আমাদের। যা করতে কিছু ভাড়া বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। যা সিএনজি অটোরিক্সার তুলনায় অনেক কম। সিএনজি অটোরিক্সাগুলো ১০০ টাকা ভাড়ার কমে আধা কিলোমিটার পথও যায় না। আগে যেখানে ১০০ টাকা ভাড়া নিত, সেখানে ৩০০ টাকা ভাড়া আদায় করছে তারা।

3

এ নিয়ে আবার কোনো প্রতিবাদ নেই সিএনজি অটোরিক্সাচালকদেরও। তারাও বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে দিনের তিনভাগের দুই ভাগ সময় পাম্পগুলোতে লাইন ধরে থাকতে হয়। যে সময় পাই তাতে ১০০ টাকার ভাড়া ৩০০ নিলেও দিনশেষে মালিকের টাকা দিতে পারছেন না। এ অবস্থায় সংসার খরচ জোগাতে এখন হিমিশম খেতে হচ্ছে।

যাত্রীরা জানান, নগরীর সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়ক কালুরঘাট-বিমানবন্দর সড়ক। এ সড়কে চলাচলকারী ১০ নম্বর বাসগুলোতে আগে উঠানামায় ১০ টাকা ভাড়া আদায় করা হত। তার স্থলে এখন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। একই রুটের একই নম্বরের মিনিবাসগুলোও একই হারে ভাড়া আদায় করছে।

নগরীর আরেক ব্যস্ততম সড়ক নতুন ব্রিজ ও বহদ্দারহাট সড়ক। এই সড়কেও উঠানামায় ১৫ টাকা এবং বহদ্দারহাট পর্যন্ত ১৫ টাকার স্থলে ২৫ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। বহদ্দারহাট-নিউমার্কেটে সড়কেও ১০ টাকার স্থলে ২০ টাকা ভাড়া আদায় করছে বাস, মিনিবাস ও টেম্পোগুলো। অক্সিজেন মোড়-চকবাজার সড়কেও ১০ টাকার স্থলে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে আপত্তি জানালেও অনেক চালক ও কর্মচারী তা আমলে নিচ্ছেন না। ফলে প্রতিদিনই বিভিন্ন গাড়িতে চালক, হেলপার ও যাত্রীদের মধ্যে বাকবিতন্ডা ও ঝগড়ার ঘটনা ঘটছে। গণপরিবহনে যাতায়াত করতে গিয়ে একজন যাত্রীকে যেখানে নির্ধারিত ভাড়া দেওয়ার কথা, সেখানে তাকে প্রতিনিয়ত ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি কিংবা তর্কে জড়াতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু বলেন, গ্যাস সংকট চলছে এটা ঠিক আছে। কিন্তু সরকার তো গ্যাসের দাম বাড়ায়নি। এমনকি গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো ঘোষণাও সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। তাহলে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে কীভাবে।

তিনি বলেন, সরকার ঘোষণা ছাড়া গণপরিবহনে নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় পুরোটাই চাঁদাবাজির মতো। বিষয়টি তাদের খোলাসা করতে হবে।

এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন সংস্থার এই নেত্রী। একই সাথে বিষয়টি সরকারকে খতিয়ে দেখার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বাংরাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) পরিচালক মানুদ আলম বলেন, গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে আমাদের কিছুই জানা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত হয়নি। এ অবস্থায় ভাড়া বৃদ্ধি অবৈধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।    

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, গ্যাসচালিত বাস, মিনিবাস ও টেম্পোর পরিচালন ব্যয় তেলচালিত যানবাহনের তুলনায় কম। এই তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যয়ের সুবিধার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এসব যানবাহনের ভাড়াও তেলচালিত পরিবহনের তুলনায় কম রাখা হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে গ্যাসচালিত যানবাহনের সার্বিক ব্যয়ের কথা বিবেচনা করলে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আসে। আমাদের দাবি, এ বিষয়ে যৌক্তিক উদ্যোগ নেওয়া হোক।

সচেতন মহলের ভাষ্য, গ্যাস সংকটের প্রভাব পরিবহন খাতে পড়তে পারে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সংকটের পুরো বোঝা সাধারণ যাত্রীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে গ্যাসচালিত যানবাহনের তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যয়ের সুবিধা যদি এতদিন যাত্রীদের জন্য কম ভাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে থাকে, তাহলে সংকটের অজুহাতে সেই ভাড়া একলাফে বাড়ানোর আগে বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও যৌক্তিকতার আওতায় আসা উচিত।

/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর