জেলা প্রতিনিধি
১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম
সংসারে অভাব-অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। বাবা মানসিকভাবে অসুস্থ, মায়েরও শারীরিক সমস্যা। তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হাঁস-মুরগি পালন করতে হয় মাকে। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা থামেনি সাইবা আক্তার মিলির। বরং নিজের চেষ্টায় এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়নের বাকাইল গ্রামের বাসিন্দা মিলি বাকাইল হাইস্কুলের শিক্ষার্থী। তার বাবা আবুল কাশেম একসময় প্রসাধনীর ব্যবসা করতেন। পাশাপাশি কবিতা লিখতেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর আর কোনো কাজ করতে পারেননি। সংসারের হাল ধরেন মা রীনা বেগম। নিজের পায়ের সমস্যার মধ্যেও হাঁস-মুরগি পালন করে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন তিনি।
মিলিরা তিন বোন। বড় বোন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন। ছোট বোন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। সংসারে নানা সংকট থাকলেও তিন মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করেননি রীনা বেগম। মিলির পড়াশোনার খরচের একটি অংশ মামারা সহযোগিতা করেছেন।
মিলি জানায়, পড়াশোনায় বেশি সময় দেওয়ার চেয়ে বুঝে পড়াকে গুরুত্ব দিত সে। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়ত। পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে নিজের মতো করে নোট তৈরি করত। মুখস্থ না করে বিষয়টি বুঝে পড়ার চেষ্টা করত। অনলাইনে ‘রেদোয়ান মেথড’-এর ক্লাসও দেখত।
পড়াশোনায় সহযোগিতা পেয়েছে শিক্ষকদের কাছ থেকেও। সাধারণ গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উচ্চতর গণিত পড়াতেন শিক্ষক রানা। তার কাছে পড়লেও মিলির কাছ থেকে কোনো টাকা নিতেন না তিনি। বড় বোনও পড়াশোনার বিষয়ে তাকে নিয়মিত শাসন করতেন।
মিলির কাছে বাবার একটি ঘটনা এখনো অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। মিলি বলেন, ‘অষ্টম শ্রেণিতে একবার পরীক্ষায় খারাপ করেছিলাম। তখন বাবা খুব কেঁদেছিলেন। বিষয়টি আমার মনে দাগ কেটেছিল। এরপর থেকে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হই।’
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় সব বিষয়েই ৮০-এর বেশি নম্বর পেয়েছে মিলি। তবে সাধারণ গণিতে পেয়েছে ৭৬। এই ফল নিয়ে কিছুটা হতাশ সে। তাই সাধারণ গণিতের খাতা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার কথা ভাবছে। তার আশা, পুনর্নিরীক্ষণে নম্বর বাড়তে পারে।
শুধু নিজের পড়াশোনা নয়, সংসারে সহযোগিতা করতে দুইজন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেটও পড়াত মিলি। অভাবের সংসারে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড়ের পাশাপাশি পরিবারের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করেছে সে।
মিলির এখনো নির্দিষ্ট কোনো পেশাগত পরিকল্পনা নেই। তবে তার স্বপ্ন বড়। বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়তে চায় সে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ইউটিউবে ভিডিও দেখে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ-সুবিধা তাকে বেশি আকৃষ্ট করে।
মিলি বলেন, ‘স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করতে চাই। নিজের মতো করে কিছু করতে চাই। এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না ভবিষ্যতে কী হব। তবে ভালোভাবে পড়াশোনা করে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।’
মিলির মা রীনা বেগম জানান, স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। নিজের পায়ের সমস্যার মধ্যেও হাঁস-মুরগি পালন করে সংসার চালিয়েছেন। তবে অভাবের কারণে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করেননি।
রীনা বেগম বলেন, ‘অনেক কষ্ট হলেও তিন মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করিনি। মিলি নিজের চেষ্টা করেছে, সবার দোয়াও ছিল। ওর ফলাফলে আমি খুব খুশি। মেয়ের পছন্দের কলেজেই ভর্তি করাব। পড়াশোনার খরচ চালাতে আমার ছোট ভাইয়েরা সব সময় সহযোগিতা করেছে।’
মিলির সাফল্যে খুশি বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও। বাকাইল হাইস্কুলের শিক্ষক পংকজ চৌধুরী বলেন, ‘অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে দারিদ্র্য হার মেনেছে। মিলি বিদ্যালয়ের গর্ব। সে যতটুকু পড়ত, মনোযোগ দিয়ে পড়ত। পড়াশোনায় কখনো ফাঁকি দিত না।’
প্রতিনিধি/এমআই