জেলা প্রতিনিধি
১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির একজন হিসেবে কারাগারে থাকা ‘সোনা মিয়া’ আসলে সেই সোনা মিয়া নন। অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয়ে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন রোহিঙ্গা নাগরিক রমজান। পরে জামিনে বেরিয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। আর তার ব্যবহৃত জন্মনিবন্ধনের প্রকৃত মালিক সোনা মিয়াকেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারে যাওয়ার পর নিজের বিরুদ্ধে থাকা মামলার কথা শুনে বিস্মিত হন সোনা মিয়া। তিনি দাবি করেন, জীবনে কখনো কোনো মামলায় আসামি হননি, এমনকি এর আগে কারাগারেও যাননি। পরে কারা কর্তৃপক্ষ পুরোনো নথি ও ছবির সঙ্গে তার তথ্য মিলিয়ে বড় ধরনের গরমিল দেখতে পায়। বিষয়টি আদালতকে জানানো হলে শুরু হয় তদন্ত। পুলিশের প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এই পরিচয় জালিয়াতির ঘটনা।
ঘটনাটি সামনে আসার পর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হয়, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ওই ইয়াবা মামলার সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন। পরে আদালতের নির্দেশে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’, পিতা নজির আহমদ, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেও তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এরপরও মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলতে থাকে। ২০২২ সালের ১৩ জুন আদালত থেকে জামিন পান ‘সোনা মিয়া’ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ের পর ওয়ারেন্টমূলে গত ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একটি দল সোনা মিয়াকে গ্রেফতার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠায়।
কারাগারে নেওয়ার দুই-তিন দিন পর সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন। তাকে কেন কারাগারে আনা হয়েছে, সেই বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান বলেন, কারাগারে আনার পর রোলকলে সোনা মিয়া জানতে চান, কী অপরাধে তাকে এখানে আনা হয়েছে। তাকে জানানো হয়, তিনি মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
এ কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়ে জানান, কোনো মামলায় তিনি কখনো আসামি ছিলেন না এবং এর আগে কখনো কারাগারেও যাননি।
পরে কারা কর্তৃপক্ষ পুরোনো নথি বের করে ২০২০ সালে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির ছবি, শারীরিক গঠন ও পারিবারিক তথ্যের সঙ্গে বর্তমান সোনা মিয়ার তথ্য মিলিয়ে দেখতে গিয়ে অসঙ্গতি খুঁজে পায়। বিষয়টি আদালতকে জানানো হলে আদালতের নির্দেশে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলীর দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস শুরু করেন। কোনো একসময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন রমজানের কাছে থেকে যায়। সেই জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগারের নথি পর্যালোচনায় ২০২০ সালে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালে গ্রেফতার সোনা মিয়ার মধ্যে শারীরিক ও পারিবারিক পরিচয়ে ব্যাপক অমিল পাওয়া যায়।
২০২০ সালে গ্রেফতার ব্যক্তির মায়ের নাম ছিল সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা নথিতে উল্লেখ ছিল।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার প্রকৃত সোনা মিয়ার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা। তার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বাম পাশ ও পিঠের মাঝখানে তিল থাকার তথ্য রয়েছে।
আদালত মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়াকেও তলব করেছিল। এ সময় তিনি লিখিতভাবে জানান, ২০২০ সালে গ্রেফতার হয়ে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।
পুলিশ সুপারের প্রতিবেদন এবং একই মামলায় কারাগারে থাকা অন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামির জবানবন্দিতেও উঠে আসে, ঘটনার সময় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া ছিলেন না।
সব প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া হয়। এরপর আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, কারাগারে থাকা ব্যক্তি ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সোনা মিয়া নন।
আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সোনা মিয়াকে মুক্তি দেওয়া হলেও তার ওপর কয়েকটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। তাকে নিজের এনআইডি ও পাসপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদেশ যেতে পারবেন না। এ ছাড়া প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজির হয়ে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি তিন মাস পর সদর থানা সোনা মিয়ার উপস্থিতি ও অবস্থান সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবে।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. বেদারুল আলম এসব নির্দেশনার কথা জানিয়েছেন।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার ওবায়াদুর রহমান বলেন, সোনা মিয়াকে মুক্তি দিতে আদালতের আদেশ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কারাগারে পৌঁছে। শুক্রবার সকালে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেলা ১১টার দিকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, সবার সহযোগিতায় একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাতে পেরেছি।
আরও পড়ুন
ছদ্মবেশে রমজানের ইয়াবা পাচার: মৃত্যুদণ্ডের মুখে নির্দোষ সোনা মিয়া
বাণিজ্য বৃদ্ধি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা
রোহিঙ্গাদের জন্য ২ কোটি ৫২ লাখ ডলারের অনুদান ঘোষণা
তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, মামলাটি দায়ের থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে কেউ পরিচয় দিলে সেটি যথাযথভাবে যাচাই করে প্রকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা প্রয়োজন ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত একজন নিরপরাধ ব্যক্তি কারাগার ও মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়াকে স্বস্তির বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কারাগার থেকে মুক্তির পর সোনা মিয়া ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গা রমজানের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই তাদের জীবনে এমন ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছিল। নিজের জন্মনিবন্ধন অন্যের হাতে চলে যাওয়ায় সেই পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করা হয়।
তারা জানান, কারা কর্তৃপক্ষ, আদালত, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের তৎপরতায় নতুন জীবন পেয়েছেন।
একই সঙ্গে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কিংবা লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তারা।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, আদালতের নির্দেশে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। শুক্রবার সোনা মিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।আদালতের আদেশের কপি থানায় পৌঁছানোর পর পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এফএ