বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ছদ্মবেশে রমজানের ইয়াবা পাচার: মৃত্যুদণ্ডের মুখে নির্দোষ সোনা মিয়া

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

শেয়ার করুন:

ছদ্মবেশে রমজানের ইয়াবা পাচার: মৃত্যুদণ্ডের মুখে নির্দোষ সোনা মিয়া

কক্সবাজারে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ‘সোনা মিয়া’ নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মামলার আসামি প্রকৃত সোনা মিয়া নন। ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে ছদ্মবেশে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান। অথচ ২০২৬ সালে সেই পরিচয়ের প্রকৃত মালিক সোনা মিয়াকেই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী এ তথ্য জানান।

আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। ওই ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। কিন্তু মামলার পুরো বিচারপ্রক্রিয়ায় তাকে সোনা মিয়া হিসেবেই আসামি করা হয় এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে থাকা প্রকৃত সোনা মিয়া দাবি করেছেন, তিনি ওই ইয়াবা মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে পুলিশ তদন্ত করে ২০২০ সালের গ্রেফতার ব্যক্তি ও ২০২৬ সালে গ্রেফতার সোনা মিয়ার পরিচয়, শারীরিক গঠন ও পারিবারিক তথ্যের মধ্যে ব্যাপক অমিল খুঁজে পেয়েছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’, পিতা নজির আহমদ, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়ার ঠিকানা এবং রামু উপজেলার গর্জনিয়াকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালিয়েও তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আসামিকে কারাগারে রেখে পরবর্তী বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার অনুরোধ করা হয়।

নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।

রায়ের পর গত ২৩ জুন র‌্যাব-১৫-এর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার ওয়ারেন্টমূলে ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেফতার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠান।

কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। কারাগারে থাকা সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান, তিনি ওই ইয়াবা মামলার আসামি নন। পরে জেল সুপার বিষয়টি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে অবহিত করেন।

আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। গত ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ।

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। ২০২০ সালের আসামি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে সোনা মিয়া পরিচয়ে ইয়াবা মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান।

পুলিশের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস শুরু করেন। কোনো এক সময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন কার্ড রমজানের কাছে থেকে যায়। সেই জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দুই সময়ের কারাগার-সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করেও পুলিশ দুই ব্যক্তির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পেয়েছে। ২০২০ সালে গ্রেফতার ব্যক্তির পিতার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। এক ছেলের নাম মোহাম্মদ আলী। তার উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার তথ্য নথিভুক্ত ছিল।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার প্রকৃত সোনা মিয়ার পিতার নামও মৃত নজির আহমদ। তবে তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা। তার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।

ঘটনাটি সামনে আসার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে। কারণ, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই উল্লেখ করেছিলেন যে সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা সঠিকভাবে যাচাই করা যায়নি। এরপরও কীভাবে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পেলেন এবং পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো- তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মন্নান বলেন, মামলাটি দায়ের থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে সেটি যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সোনা মিয়ার প্রকৃত নাম যে রমজান, সেটিও তদন্তে বের করা হয়নি। ফলে প্রকৃত আসামি জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। পরে তার পরিবর্তে প্রকৃত সোনা মিয়াকে খুঁজে বের করে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

তার মতে, আদালতের নির্দেশে পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে ২০২০ ও ২০২৬ সালের দুই ব্যক্তির তথ্যের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। এখন আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টির আইনগত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।

মামলায় গ্রেফতার সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, তার স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়াননি এবং কারাগারেও যাননি। হঠাৎ র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পর তারা জানতে পারেন, এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবার একটি মামলায় তার স্বামীর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, তার স্বামী রোহিঙ্গা নন, রামুর বাসিন্দা। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। ওই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছিল বলে তারা জানতেন। অথচ এখন সেই মামলায় তার স্বামীকে আসামি করা হয়েছে।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, আদালতের নির্দেশে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করেছে। বুধবার (১২ আগস্ট) মামলায় সোনা মিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের দাখিল করা প্রতিবেদন নিয়ে আদালতে আদেশ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বেলা ২টা পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর