Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

১৩ প্রাণের শোকে স্তব্ধ নওগাঁ, স্বজনদের কান্নায় ভারী আকাশ

জেলা প্রতিনিধি

১০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২০ এএম

সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছিলেন নওগাঁর ১৩ জন। প্রবাসের কঠিন জীবনেও স্বজনদের জন্য স্বপ্ন বুনছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় তাদের। সৌদির রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। এই ১৩ জনের সঙ্গে প্রাণ গেছে আরও তিন বাংলাদেশির। তাদের বাড়ি পাশের জেলার নাটোরে।

স্বজন হারিয়ে এখন শোক আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এসব পরিবার। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।

গতকাল রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহত সবাই বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত করে সেখানে কর্মরত ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) মোহাম্মদ রেজায়ে রাব্বী জানান, রোববার দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে কারখানাটিতে আগুন লাগে। আগুনে মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় নিহতদের শনাক্ত করতে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

প্রথমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রোববার দিবাগত রাতে জানায়, নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে ১০ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাইয়ে এবং তিনজন নাটোরের বাসিন্দা। বাকি তিনজনের পরিচয় জানানো হয়নি। পরে এই তিনজনও নওগাঁর বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। 

নিহতদের মধ্যে চারজন একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন- আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের মহন প্রামাণিক (২২), তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০), কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)।

এই উপজেলার নিহত অন্যরা হলেন- উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮)।

পরিবার ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা সৌদি আরবের রিয়াদে ওই সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে চারজন গন্ডগোহালি গ্রামের বাসিন্দা। চার পরিবারই দরিদ্র। পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরব পাড়ি জমান তারা। চারজনই ছিলেন অবিবাহিত।

নিহতদের স্বজনেরা জানান, প্রবাসে থেকে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার স্বপ্ন দেখছিলেন তারা। কেউ পরিবারের হাল ধরার আশায়, কেউবা নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক ভয়াবহ আগুনে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।

গন্ডগোহালি গ্রামে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে এখন শুধু কান্নার শব্দ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তাদের কেউ আবার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।

তাদের চোখের পানি দেখে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোরও চোখ ভিজে যাচ্ছে। একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেরাই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোক আর বুকফাটা আহাজারি।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতেই নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে সৌদির আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া নাটোরের তিনজন হলেন- নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়ন শ্রীপুরপাড়া গ্রামের মো. রাব্বানীর ছেলে সাব্বির হোসেন শুভ, দিঘীরপাড় এলাকার মো. জাখের আলীর ছেলে শামীম হোসেন এবং মহিষডাঙ্গা এলাকার আসলাম শেখের ছেলে রবিউল আউয়াল হৃদয়।

প্রতিনিধি/এমআর