জেলা প্রতিনিধি
০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
জামালপুরের মেলান্দহে প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারাসহ কয়েকটি ধারায় মামলা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ টি এম মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, মামলার এজাহারে যে ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এমনকি মামলার বাদীর গুরুতর আঘাতের দাবির পক্ষেও হাসপাতালের নথিতে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে দাবি তাদের।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) মেলান্দহ উপজেলার মুন্সী নাংলা গ্রামের আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী মোছা. কল্পনা (৩০) বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় একই গ্রামের মো. আসাদ মিয়া (৪২) ও তার স্ত্রী মোছা. সাহারা বেগমকে (৩৭) আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭ ও ৫০৬ ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিদের কাছ থেকে ২০ শতাংশ জমি বন্ধক নেওয়ার জের ধরে গত ৩ আগস্ট সকালে আসাদ মিয়া কাঁচি দিয়ে কল্পনার দুই হাতের কবজি ও গলায় আঘাত করেন। আর সাহারা বেগম রড দিয়ে পিটিয়ে তার পিঠ, কোমর, হাত ও পায়ে জখম করেন। পরে তাকে উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তার সাক্ষীর মাধ্যমে থানায় মামলার কাগজ পাঠানো হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কল্পনার পরিবারের দাবি, এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। হাসপাতালের নথিতেও গুরুতর আঘাতের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তারা দাবি করেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে কল্পনার বাড়িতে গিয়ে তার দুই কবজিতে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কোনো উত্তর দেননি। তবে কল্পনা স্বীকার করেন, গত ২১ জুলাই মামলার আসামি ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে তার হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট ওই এলাকায় কল্পনা ও মামলার আসামিদের মধ্যে এজাহারে বর্ণিত ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তারা দাবি করেন।
কল্পনার এক প্রতিবেশী ফজলু মিয়া বলেন, ‘ওই দিন কোনো ঝামেলা হওয়ার কথা আমরা শুনিনি। এরপরও কীভাবে এমন মামলা হলো, তা এলাকার অনেকেরই বোধগম্য নয়।’
তবে মামলার প্রধান আসামি আসাদ মিয়া অভিযোগ করেন, পূর্বের বিরোধের জের ধরে তাদের হয়রানি করতে মামলাটি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গত ২১ জুলাই মামলার বাদী, তার শ্বশুর আব্দুল আওয়ালসহ কয়েকজন আমার বাড়িতে ঢুকে আমাদের মারধর করেন এবং স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যান। এ ঘটনায় পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে। ঘটনার সত্যতা থাকায় আমি ২৩ জুলাই থানায় মামলা করি। ওই মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিনে বের হওয়ার পর আমাদের হয়রানি ও চাপ প্রয়োগের উদ্দেশে এই মামলা করা হয়েছে।’
আসাদ আরও বলেন, ‘৩ আগস্ট তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো দেখা হয়নি। মামলায় বর্ণিত ঘটনাও ঘটেনি। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আমাদের এই মামলা থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
আরেক আসামি সাহারা বেগম বলেন, ‘শরীরে গুরুতর আঘাত না থাকার পরও কীভাবে ৩২৬ ধারায় মামলা নেওয়া হলো, তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। মিথ্যা মামলায় আমরা হয়রানির শিকার হলে এর দায় কে নেবে?’
প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই মামলা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মেলান্দহ থানার ওসি এ টি এম মাহমুদুল হক বলেন, ‘ভুক্তভোগী নারী থানায় এসে চাপ প্রয়োগ করায় আপাতত এফআইআর করা হয়েছে। তিনি বোরকা পরে আসায় তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখার সুযোগ হয়নি।’
তবে কারও সুপারিশে মামলা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি বলেন, ‘তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা হবে। ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হলে বাদীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত ছাড়া এ ধরনের মামলা করা পুলিশের গাফিলতি।’ তার মতে, আঘাতের বিষয়টি যাচাইয়ে নারী পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে বাদীর শরীর পরীক্ষা করা যেতে পারে। কোনো মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে আসামিপক্ষ হয়রানির শিকার হলে পুলিশও দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামালপুরের পুলিশ সুপার মোছা. ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি। মূলত ওই নারী হাসপাতালের কাগজ নিয়ে ওসির ওপর চাপ প্রয়োগ করার পর মামলা নেওয়া হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে, ৩২৬ ধারার সনদ না এলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। হাসপাতালের কাছে মেডিকেল সার্টিফিকেট চাওয়া হয়েছে। মেডিকেল রিপোর্ট বিশেষজ্ঞ মতামত। সেটির ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই নারী মিথ্যা বলে থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রতিনিধি/এসএস