জেলা প্রতিনিধি
০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
‘একদিন কাজ করতে না পারলেই সংসারে চুলা জ্বলে না। আজ সাইকেল কাঁধে নিয়ে কোমরসমান পানি পার হয়ে কাজে যাচ্ছি। আর কত দিন এভাবে চলতে হবে, জানি না।’
কথাগুলো বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার জোড়াবাড়ী ইউনিয়নের পুব হলহলিয়া গ্রামের দিনমজুর জসিম উদ্দিন।
রোববার (২ আগস্ট) হরিডারা নদীর ওপর নির্মিত একটি স্লুইসগেট ধসে পড়ে পাশের একটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়। এর একদিন পর সোমবার (৩ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভেঙে যাওয়া স্লুইসগেটের স্থানটি এখন দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যাতায়াতের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা কোমরসমান পানিতে নেমে সাইকেল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নদী পার হচ্ছেন। শিশু, নারী, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষ—সবাই চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
জসিম উদ্দিন স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। প্রতিদিন কাজ না করলে তার মজুরি মেলে না। তিনি বলেন, বিকল্প পথ দিয়ে যেতে হলে সাত থেকে আট কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এতে কাজে পৌঁছাতে দেরি হয়, খরচও বাড়ে। তাই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই নদী পার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই স্লুইসগেট দিয়েই কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি আশপাশের কৃষিজমির পানি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। স্লুইসগেট ধসে পড়ার পর শুধু একটি বসতবাড়িই নদীগর্ভে বিলীন হয়নি, কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ পরিবার এখন দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন ভ্যান ও অটোরিকশাচালকেরা। যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

ভ্যানচালক রশিদুল ইসলাম বলেন, আগে এই রাস্তা দিয়েই সহজে মহাসড়কে উঠে যাত্রী পাওয়া যেত। এখন গ্রামের ভেতর দিয়ে সাত থেকে আট কিলোমিটার ঘুরে যেতে হচ্ছে। যাতায়াতেই গাড়ির ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সে অনুযায়ী ভাড়া পাওয়া যায় না।
অটোরিকশাচালক মো. শাহিন আলম বলেন, রাস্তা বন্ধ হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা। দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে গিয়ে ব্যাটারির চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ফলে আগের মতো ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, আয়ও কমে গেছে।
স্থানীয় ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, গাড়ি চালিয়েই তাদের সংসার চলে। এখন মহাসড়কে যেতে অনেক দূর ঘুরতে হয়। এতে সময় ও ব্যাটারির চার্জ—দুটিই বেশি খরচ হচ্ছে। যেসব এলাকায় বেশি ভাড়া পাওয়া যেত, সেখানে এখন আর যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত অন্তত একটি অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় কৃষক মো. আহিনুর ইসলাম বলেন, এই স্লুইসগেটের ওপর নির্ভর করে শত শত বিঘা জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। এখন পানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।
জোড়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হাবীব বাবু বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আপাতত মানুষের চলাচলের জন্য একটি অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রোববার দুপুরে হরিডারা নদীর ওপর নির্মিত স্লুইসগেটটির নিচে ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি প্রবেশের পর ভাঙনের সৃষ্টি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং পাশের একটি বসতবাড়ির বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
এদিকে এখনো ভাঙা স্থানে কোনো অস্থায়ী সেতু বা বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে কোমরসমান পানি পেরিয়ে নদী পার হচ্ছেন শত শত মানুষ। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা, স্থায়ী স্লুইসগেট নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
প্রতিনিধি/এসএস