সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

লিচুর রাজ্যে ‘নতুন অতিথি’, লংগান চাষে দিনাজপুরের রিফাতের বাজিমাত

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

লিচুর রাজ্যে ‘নতুন অতিথি’, লংগান চাষে দিনাজপুরের রিফাতের বাজিমাত
মাওলানা মনিরুজ্জামান রিফাত

ভিনদেশি ফল, অথচ ফলছে লিচুর রাজ্য দিনাজপুরের মাটিতে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে লিচুর বাগান, কিন্তু কাছে গেলেই মিলবে চমক। থোকায় থোকায় ঝুলছে বাদামি রঙের ছোট ছোট লংগান। একসময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে চাকরি করার সময় যে ফলের প্রেমে পড়েছিলেন মাওলানা মনিরুজ্জামান রিফাত, সেই ফলই আজ তার হাত ধরে বাণিজ্যিকভাবে জায়গা করে নিয়েছে দিনাজপুরে। জেলার প্রথম বাণিজ্যিক লংগান বাগান গড়ে তুলে তিনি শুধু নিজের সফলতার গল্পই লেখেননি, উত্তরাঞ্চলের কৃষিতেও যোগ করেছেন নতুন সম্ভাবনার এক অধ্যায়।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়নের জোতকৃষ্টাই গ্রামের উদ্যোক্তা মাওলানা মনিরুজ্জামান রিফাতের প্রায় দুই একরের বাগানে এখন চোখজুড়ানো দৃশ্য। চারপাশজুড়ে সারি সারি লংগান গাছ। প্রতিটি গাছেই থোকায় থোকায় ফল। দূর থেকে দেখতে অনেকটা লিচুর মতো হলেও খোসার ভেতরে থাকা স্বচ্ছ সাদা শাঁস ও মধুর স্বাদই আলাদা করে চিনিয়ে দেয় এই ফলকে।

বাগান ঘুরে দেখা যায়, অর্ধশতাধিক গাছে এবার প্রচুর ফল এসেছে। এখানে চাষ করা হয়েছে ভিয়েতনামের জনপ্রিয় দুটি জাত পিংকন ও পিংপং। দেশে নতুন ও উচ্চমূল্যের ফল হিসেবে লংগানের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

47e4c71c-d0b6-4b78-abd8-7c418215de2b

কৃষি বিভাগের মতে, সঠিক পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে লংগান চাষ কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক বিকল্প হতে পারে।

উদ্যোক্তা মনিরুজ্জামান রিফাত দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সেখানেই প্রথম পরিচয় হয় লংগান ফলের সঙ্গে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশে ফিরে ২০২২ সালে চুয়াডাঙ্গার একটি নার্সারি থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা দামে ৫০টি চারা সংগ্রহ করেন। পরে আরও ৭৫টি চারা কিনে নিজের পোলট্রি খামারের চারপাশে দুই একর জমিতে রোপণ করেন। চার থেকে পাঁচ বছরের পরিচর্যার পর এখন প্রায় প্রতিটি গাছেই এসেছে কাঙ্ক্ষিত ফলন।

মনিরুজ্জামান রিফাত বলেন, আবুধাবিতে প্রায়ই ফলের ঝুড়িতে লংগান দেখতাম। স্থানীয়রা খুব আগ্রহ নিয়ে এই ফল খেত। আমিও খেয়েছি। তখন থেকেই মনে হয়েছিল, দেশে ফিরে সুযোগ পেলে এই ফলের চাষ করব।

রিফাত আরও বলেন, গত বছর আমার বাগান থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার লংগান বিক্রি হয়েছে। এ বছর ফলন আরও ভালো হওয়ায় অন্তত ১০ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছি।

তিনি বলেন, আমার বাগান দেখে আশপাশের অনেক কৃষক এবং পাশের জেলার উদ্যোক্তারাও আগ্রহী হয়েছেন। অনেকে চারা কিনতে আসছেন। তবে চাহিদার তুলনায় এখনো পর্যাপ্ত চারা সরবরাহ করতে পারছি না।

ebdd70a4-3ffe-4cb5-a767-1a34895dd3a9

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা বলেন, চিরিরবন্দরে এটিই প্রথম বাণিজ্যিক লংগান বাগান। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি গাছ থাকলেও এত বড় পরিসরে ফলন এবারই প্রথম তাদের নজরে এসেছে। বাগানে চাষ করা ভিয়েতনামের পিংপং জাতের লংগানে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম। ফলে খুব কম কীটনাশক ব্যবহার করেই নিরাপদভাবে ফল উৎপাদন সম্ভব। এতে উৎপাদন খরচ যেমন কমে, তেমনি ভোক্তারাও নিরাপদ ফল পান।

কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা আরও বলেন, একসময় বিদেশের ফল হিসেবে পরিচিত লংগান আজ দিনাজপুরের মাটিতে সম্ভাবনার নতুন বীজ বুনেছে। মাওলানা মনিরুজ্জামান রিফাতের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে অপ্রচলিত ফলের চাষও হতে পারে লাভজনক। তার এই সফলতা এখন শুধু একটি বাগানের গল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার এক অনুপ্রেরণার নাম। সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে লংগান হতে পারে দিনাজপুরের আরেকটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফল।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর