জেলা প্রতিনিধি
২৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সম্প্রতি গ্রেফতার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেনের বাড়ি সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার হোসেনপুরে। একটা সময় এই বাড়িতে আসতেন তিনি। ১৯৯৭ সালে একবার তার সন্ধান পেয়ে সেখানে হানা দিয়েছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। তাকে বিএনপির নেতাকর্মীরা চেহারায় চিনতে না পারায় ধরা পড়েননি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে প্রায়ই মোজাফফর হোসেন সিরাজগঞ্জে আসতেন। এমনকি ২০১৯ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১৫০ বছর পূর্তির নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয় এই খুনিকে। তবে সেই বাড়িটি এখন পরিত্যক্ত। এখানে আর তার কেউ থাকেন না।
গত ১৫ জুলাই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার করে। এরপর থেকেই তার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি উঠছে নানা মহল থেকে। বর্তমানে সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিটে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ডদের খুঁজে বের করতে রিমান্ড ও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ বিএনপির নেতারা। মোজাফফরের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে সিরাজগঞ্জকে কলঙ্কমুক্ত করার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
১৯৯৭ সালের নভেম্বরে হাতের কাছে পেয়েও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি মোজাফফর হোসেনকে ধরতে পারেননি বলে জানান সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খোরশেদ আলম মিন্টু। অনেকটা আক্ষেপ করে তিনি ঢাকা মেইলকে বলছিলেন- ‘খুনি আমাদের চিনেছিলেন। সম্ভাব্য পরিণতিও তিনি বুঝেছিলেন। তবে আমরা তাকে চেহারায় চিনতাম না। এই সুযোগটিই কাজে লাগান তিনি। আমরা তাকেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম- মোজাফফর হোসেনের বাসা কোনটি। তিনি ধীরস্থিরভাবে বাসা দেখিয়ে দিলেন। আমরা সেখানে গেলাম। বাড়ির ভেতরে-বাইরে ভাঙচুর হলো। কিন্তু তাকে পেলাম না। এরই মধ্যে পুলিশ এলো। বেপরোয়া মারধরের শিকার হলাম আমরা।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘ওই নভেম্বরের দিন-তারিখ এখন আর মনে নেই। জেলা বিএনপির কার্যালয়ে বসেছিলাম। হঠাৎ খবর এলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খুনি মোজাফফর হোসেন সিরাজগঞ্জ পৌরসভার হোসেনপুরের আল মাহমুদ সড়কে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। হালকা শীতের সন্ধ্যা। আমরা সেখানে সঠিক সময়েই পৌঁছেছিলাম। তবে চেহারা অচেনা থাকায় মোজাফফর হাতের নাগালে এসেও পালিয়ে যেতে পারলেন।’
মিন্টু আরও বলেন, ‘পরে সিনিয়র অনেকের কাছে চেহারা বর্ণনা করে জানতে পারি মোজাফফরের কাছেই আমরা তার বাসার ঠিকানা জানতে চেয়েছিলাম।’
২০১৯ সালের ৩১ মার্চ। সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহরের শহীদ এম মনসুর আলী মিলনায়তনে গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে যারা সংবর্ধনা পান, তাদের একজন ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খুনি মোজাফফর হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ আবদুর রউফ মুক্তা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই পলাতক তিনি।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উপলক্ষে ‘স্যুভেনির’ প্রকাশ করেছিল সিরাজগঞ্জ পৌরসভা। তাতে প্রকাশিত ছবিতে মোজাফফরকে মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ছবিতে তার নাকের ঠিক নিচে একটি তিল বা আঁচিলসদৃশ কালো দাগ দেখা যায়। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়ার পর মোজাফফরের এই জন্মচিহ্ন আলোচিত হয়। নাকের নিচে থাকা এই জন্মচিহ্ন তাকে গ্রেফতারে ভূমিকা রেখেছে বলে এরই মধ্যে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
আরও পড়ুন
জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খুলছেন খুনি মোজাফফর, উন্মোচন হতে পারে নানা রহস্যের জট
বিদেশি সাংবাদিকের বইয়ে জিয়া হত্যায় মোজাফফরের ভূমিকার বর্ণনা
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে মোজাফফর তার ছোটভাই পরাগকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় প্রেসক্লাবে যান। সাংবাদিকদের সাথে কিছুটা সময়ও কাটান বলে জানান এক প্রবীণ সাংবাদিক। নাম প্রকাশ না করে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা জানতাম তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় অভিযুক্ত। সিরাজগঞ্জে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। সামাজিক অনুষ্ঠানেও তিনি যেতেন। এটা ওপেন সিক্রেট ছিল।’ আরেকজন প্রবীণ সাংবাদিকও বিভিন্ন সময়ে মোজাফফরের সিরাজগঞ্জে অবস্থানের খবর নিশ্চিত করেছেন।
সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ও তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত মুখ মোজাফফর। বন্ধুদের কাছে পরিচিতি ‘মোজাম’ নামে। বাবার নাম লুৎফার রহমান; দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড়। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নিয়ে সিরাজগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলে (ভাটপিয়ারী, কাজিপুর অঞ্চল) বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বিএলএফ) কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৫ জনের একটি গেরিলা দল ‘কমান্ড’ করতেন তিনি।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ৫৫১ নম্বরে আছে মোজাফফর হোসেনের নাম। সেখানে তাকে অবসরপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হলেও কোন বাহিনী, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন তা উল্লেখ নেই।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিরাজগঞ্জ জেলা কমান্ডের সাবেক এক কমান্ডার জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে ভাটপিয়ারী এলাকায় একজন মুক্তিযোদ্ধা খুন হন। ওই খুনের সঙ্গে নাম জড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সিরাজগঞ্জের রাজনীতিতে সুবিধা করতে পারেননি মোজাফফর। এ অবস্থায় ১৯৭২ সালে রক্ষীবাহিনী গঠন হলে প্রথম ব্যাচেই যোগ দেন। তার পদবি ছিল ‘লিডার’। রক্ষীবাহিনীতে মোজাফফর ছিলেন প্রথম ব্যাচের ‘লিডার’। এই বাহিনীর ষষ্ঠ ব্যাচের ‘লিডার’ ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। একই বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে মোজাফফর ও মাসুদ ছিলেন পরস্পরের পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠ।
সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সেরাজুল ইসলাম সেরাজ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খুনি মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতারের শহরে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। একই সাথে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানানো হয়। আমরা সিরাজগঞ্জবাসী এখন তার সর্বোচ্চ শাস্তি দেখার অপেক্ষায় আছি।’
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসলাম উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে মাঝে মধ্যে সিরাজগঞ্জে আসতেন খুনি মোজাফফর হোসেন। এমনকি ২০১৯ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে খুনি এই মোজাফফর হোসেনকে নাগরিক সংবর্ধনা দেন তৎকালীন মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রউফ মুক্তা। আমরা এই খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খুনিকে ফাঁসির আওতায় এনে সিরাজগঞ্জকে কলঙ্কমুক্ত করার দাবি জানান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। দ্রুত সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করে এই খুনের সঙ্গে জড়িত মাস্টারমাইন্ডদের খুঁজে বের করার দাবিও তিনি করেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের সামরিক তদন্তের পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়, মোজাফফর হোসেন ছিলেন তাদের অন্যতম। ঘটনার পর থেকেই তিনি ফেরারি ছিলেন। প্রায় ৪৫ বছর পর তিনি গত ১৫ জুলাই ধরা পড়েন ডিবি পুলিশের হাতে।
প্রতিনিধি/জেবি