শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বিদেশি সাংবাদিকের বইয়ে জিয়া হত্যায় মোজাফফরের ভূমিকার বর্ণনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম

শেয়ার করুন:

বিদেশি সাংবাদিকের বইয়ে জিয়া হত্যায় মোজাফফরের ভূমিকার বর্ণনা

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন প্রায় ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে দেশেই আত্মগোপনে ছিলেন। মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেন। পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকলেও এতদিন তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে বুধবার রাতে গ্রেফতার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার নানা কৌশলের কথা জানিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের পর বিদেশে পালিয়ে গেলেও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশে ফেরেন বলে জানিয়েছেন। এরপর বিভিন্ন জেলা ঘুরে কয়েক বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। জীবনের শেষ সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানোর ইচ্ছা থেকেই রাজধানীতে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি সেনা হেফাজতে রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ডিবি সূত্র জানায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরদিন তিনি ভারতে পালিয়ে যান। প্রথমে বিভিন্ন রাজ্যে ঘোরাঘুরির পর কলকাতায় অবস্থান নেন। সেখানে বিভিন্ন ভাড়া বাসায় থাকার সময় তিনি বুঝতে পারেন, দ্রুত দেশে ফেরা সম্ভব হবে না। পরে ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকেন। ওই জাল পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে পাসপোর্টও তৈরি করেন। ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা যেন তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারে। বাস্তবেও দীর্ঘদিন তাই হয়েছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল কিংবা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার প্রকৃত পরিচয়ে কোনো সন্ধান পায়নি।

ডিবি সূত্রের দাবি, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন মোজাফফর। কলকাতায় প্রায় ১৭ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৯৮ সালে গোপনে দেশে ফেরেন। এরপর থেকে ২৮ বছরের বেশি সময় তিনি বাংলাদেশেই অবস্থান করেছেন বলে দাবি করেন। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভাড়া বাসায় ছিলেন। গোয়েন্দারা তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য না পাওয়ায় তিনি মনে করেছিলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হয়তো আর কেউ তার খোঁজ পাবে না। সে কারণেই জীবনের শেষ সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। কয়েক বছর ধরে রাজধানীর ডিওএইচএস এলাকায় শ্বশুরের একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। একই ফ্ল্যাটে শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যরাও থাকতেন। তবে নিজের প্রকৃত নাম-পরিচয় গোপন রাখায় কেউ ধারণাও করতে পারেনি যে, এমন একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ঢাকাতেই বসবাস করছেন।

মোজাফফরকে গ্রেফতার করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকা কী ছিল এবং ঘটনার সময় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে সাড়ে চার দশকের বেশি সময় ধরে তার আত্মগোপনের রহস্যও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ: অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড বইয়ে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের একটি বিবরণ তুলে ধরেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত থাকার মধ্যেই মোজাফফরের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যার প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে আবার সার্কিট হাউসে যান। সেখানে জিয়াউর রহমানের কক্ষ তল্লাশি করে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরা হয়। পরে জিয়াউর রহমান এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে করে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের দফতরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে মঞ্জুর বিপ্লবী পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেন। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর পরদিন ভোরে মঞ্জুর ও সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ত্যাগ করেন। সামনের জিপে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব, মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর রহমান ও মাহবুব নিহত হন এবং মুনীর গ্রেফতার হন। তবে সেই সময় মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর