Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

গাজীর ভিডিওকাণ্ড: কপাল খুলছে কি বিএনপির, না পরওয়ার-শিশির মনিরের

জেলা প্রতিনিধি

২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৯ এএম

সাতক্ষীরা-৪ আসনকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও বিতর্কের জেরে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। 

এরপর থেকেই এলাকায় শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা, এই বিতর্ক কি জামায়াতের শক্ত ঘাঁটিতে ধস নামাবে? উপ-নির্বাচন হলে কি দীর্ঘদিন পর বিএনপির কপাল খুলতে পারে?

স্থানীয় রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নেওয়া সাংগঠনিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত তার সংসদ সদস্য পদে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না। একই সঙ্গে সম্ভাব্য উপ-নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ভোটারদের মধ্যেও শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ।

আরও পড়ুন

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতপ্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছিলেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট। ২১ হাজার ৪৮৭ ভোটের ব্যবধানে জয় পান গাজী নজরুল।

নির্বাচনের পর জামায়াত নেতাকর্মীরা এটিকে দলটির অন্যতম বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছিলেন। কারণ দীর্ঘদিন পর এই আসনে জামায়াত সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ভিডিও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন গাজী নজরুল ইসলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। প্রথমে ভিডিওটিকে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করা হলেও পরে সংশ্লিষ্ট নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। এরপরও বিতর্ক থামেনি। বরং একের পর এক ভিডিও প্রকাশ এবং জনমতের চাপে শেষ পর্যন্ত তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী।

ভিডিও বিতর্কের পর টানা কয়েকদিন ধরে শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশ গাজী নজরুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেছে। জামায়াতের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের ঘটনাও ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

স্থানীয় অনেকেই মনে করছেন, শুধু দলীয় বহিষ্কার নয়, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। আবার অনেকে এটিকে জামায়াতের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতি হিসেবে দেখছেন।

তবে রাজনৈতিক আলোচনা যতই তুঙ্গে উঠুক, বাস্তবতা হলো- শুধু দল থেকে বহিষ্কার হলেই সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না।

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী এস এম বিপ্লব হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে দলীয় সিদ্ধান্ত পাঠানো হতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র সেই চিঠির ভিত্তিতে আসন শূন্য ঘোষণা করার ক্ষমতা ইসির নেই।

আরও পড়ুন

তার ভাষায়, সংবিধানের আলোকে শুধুমাত্র দলীয় বহিষ্কারের কারণে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই। যদি তিনি নিজে পদত্যাগ করেন, কিংবা সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত কোনো কারণ সৃষ্টি হয়, তখন বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। ফলে আপাতত উপ-নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

সাতক্ষীরার সমাজসেবক ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, এই ঘটনা ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলবে বলেই তিনি মনে করেন। 

তিনি বলেন, মানুষ একটি রাজনৈতিক দলকে শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, নৈতিকতার কারণেও মূল্যায়ন করে। জামায়াত তাদের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু মানুষের মনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- সেটি সহজে দূর হবে না। 

তার মতে, উপ-নির্বাচন হলে বিএনপি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান। তিনি অভিযোগ করেন, গত নির্বাচনে প্রকৃত ভোটের প্রতিফলন হয়নি। 

মনিরুজ্জামানের দাবি, ফলাফল ঘোষণার শুরুতে তিনি এগিয়ে ছিলেন। পরে ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়ায় নাটকীয় পরিবর্তন আসে।

তার ভাষায়, গাজী নজরুল ইসলামের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষ বিব্রত। যদি উপ-নির্বাচন হয় এবং দল আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি অবশ্যই নির্বাচন করব। তবে সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। 

তিনি আরও বলেন, গত পাঁচ মাসে মানুষের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন।

উপ-নির্বাচন হলে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান, জেলা বিএনপির সদস্য ও শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ। 

দলীয় সূত্র বলছে, গত নির্বাচনে মনিরুজ্জামান ভালো ভোট পাওয়ায় তিনি মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে থাকতে পারেন।

জামায়াতের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক জটিল। একদিকে তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করতে হয়েছে, অন্যদিকে ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, শিশির মনির, জেলা সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান, শ্যামনগর উপজেলা আমির মাওলানা আব্দুর রহমান। 

তবে দলীয় সূত্র বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই নেবে।

আরও পড়ুন

জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলছি। নির্বাচনের বিষয়ে দল যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেই অনুযায়ী কাজ করব। 

তিনি স্বীকার করেন, সাম্প্রতিক ঘটনা নির্বাচনে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। 

তবে তার দাবি, অনৈতিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা নেওয়ায় ভোটাররা ইতিবাচক বার্তা পাবে।

সম্ভাব্য উপ-নির্বাচন ঘিরে আলোচনায় যোগ হয়েছে আরেকটি নাম- হিরো আলম। এক অডিওবার্তায় তিনি জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে সাতক্ষীরা-৪ আসনের উপ-নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। 

তার ভাষায়, যেখানে উপনির্বাচন হবে, আমি সেখানে দাঁড়াতে চাই। জনগণ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা দেখতে চাই।

স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত- সব বড় রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছেন। এই ইতিহাস বলছে, সাতক্ষীরা-৪ আসনে ভোটাররা অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন দিয়েছেন। ফলে উপ-নির্বাচন হলে ফলাফল আগেভাগে অনুমান করা কঠিন।

গাজী নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে হতাশা প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা এহসান আলী বলেন, আমরা গর্ব করতাম- আমাদের গ্রামের একজন সংসদ সদস্য হয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের বিব্রত করেছে।

তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, এলাকার পানি সংকট নিরসনে গাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা ছিল এবং স্থানীয় উন্নয়নে তিনি কাজ করেছেন।

আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ছোটবেলা থেকে তাকে ভালো মানুষ হিসেবেই জানতাম। কিন্তু এখন যা দেখছি, তাতে আমরা কষ্ট পেয়েছি।

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় আসনটি শূন্য হয় এবং উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি আসনের নির্বাচন হবে না; বরং এটি হবে জামায়াতের সাংগঠনিক সক্ষমতা, বিএনপির পুনরুত্থানের সম্ভাবনা এবং ভোটারদের নৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

সাতক্ষীরা-৪ এখন শুধু একটি সংসদীয় আসন নয়। এটি পরিণত হয়েছে- দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে। উপ-নির্বাচন হলে সেই পরীক্ষার ফলই বলে দেবে, বিতর্কের রাজনৈতিক মূল্য কতটা এবং ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন বার্তা দিতে চান।

প্রতিনিধি/এলএ