রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

কোন সমীকরণে সংসদে টিকে থাকছেন গাজী নজরুল?

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

কোন সমীকরণে সংসদে টিকে থাকছেন গাজী নজরুল?
গাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার জেরে জামায়াত থেকে বহিষ্কার সাতক্ষীরা-৪ আসনের গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে তাকে বহিষ্কারের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে-দলের এই সিদ্ধান্তে কি তার সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়ে যাবে, নাকি সাংবিধানিক সুরক্ষায় তিনি পুরো মেয়াদে এমপি হিসেবে বহাল থাকবেন? তবে নিয়ম অনুযায়ী শুধু দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার কারণে আপাতত তার সংসদ সদস্য পদ যাবে না। কিন্তু সংসদ সদস্য বিরোধ নিষ্পত্তি আইন অনুযায়ী, জামায়াত এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয়কে চিঠি দিলে স্পিকার প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) চিঠি দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বলবেন। এরপর কমিশন শুনানি গ্রহণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন শুনানি শেষে গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দিলে পরে তার আসন শূন্য ঘোষণা করবে। এছাড়া গাজী নজরুল ইসলাম নিজে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করলে তার আসন শূন্য হবে। পরবর্তী সময়ে এই আসনে উপনির্বাচন হবে।

আরও পড়ুন

গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদের কী হবে?

দল থেকে বহিষ্কার করলেই কি কোনো সংসদ সদস্যের আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে খালি হয়ে যায়- সংবিধানের ৭০ ও ৬৬ অনুচ্ছেদে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট আইনি অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। ফলে জামায়াত বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করার সিদ্ধান্ত নিলেও, সংবিধানের অনুচ্ছেদ, আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা এবং অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে—কেবল দলীয় বহিষ্কারের অজুহাতে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা আইনগতভাবে বেশ জটিল।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদদের মতে, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বহিষ্কারাদেশ দিয়ে সংসদীয় আসন খালি করার কোনো প্রত্যক্ষ আইনি ভিত্তি সংবিধানে নেই। আইন অনুযায়ী, দল থেকে বহিষ্কারের পর কোনো এমপির পদ থাকবে কি না তা নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হলে সংসদ সচিবালয় বা স্পিকারের মাধ্যমে বিষয়টি সিইসির কাছে পাঠানো আবশ্যক। কমিশন তখন দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।

Jamat2
ইসিতে চিঠি দেবে জামায়াত। ছবি: সংগৃহীত

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় চিঠির অপেক্ষায় রয়েছে ইসি ও সংসদ সচিবালয়। জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ঢাকা মেইলকে বলেন, জামায়াতের চিঠি এখনো এখানে আসেনি। চিঠি আসার পর আইন ও প্রয়োজনীয় বিধি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিতর্কিত কন্টেন্টের সত্যতা নিজস্ব তদন্তে উঠে আসার পর বুধবার (২২ জুলাই) জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে এই চূড়ান্ত সাংগঠনিক ব্যবস্থার অনুমোদন দেয়।

রাজধানীর মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সংগঠনের আমির ডা. শফিকুর রহমান সভাপতিত্বে বিকেল ৪টায় ওই জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জামায়াত জানায়, সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জনাব গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২নং ধারা অনুযায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই সঙ্গে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়।

সংবিধানের সাংঘর্ষিক সমীকরণ: যেখানে আটকে যাচ্ছে সিদ্ধান্ত

প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতা ও আসন খালি হওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হয় সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদের জটিল সমীকরণে, যেখানে বহিষ্কৃত এমপির ভাগ্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দুটি ক্ষেত্রে আসন শূন্যের কথা বলা হয়েছে এমপি নিজে থেকে দল ত্যাগ/পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে। কিন্তু দল থেকে কাউকে ‘বহিষ্কার’ করলে পদ যাবে কি না- সে বিষয়ে সংবিধান পুরোপুরি নীরব।

আরও পড়ুন

এমপি গাজী বহিষ্কার: জামায়াতের চিঠি আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই ইসির

আর ৬৬ (২) অনুচ্ছেদের বিচারিক বাধ্যবাধকতার কথা বলা আছে। এখানে বলা হয়েছে, কোনো এমপি ‘নৈতিক স্খলনজনিত’ ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে আদালত কর্তৃক কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তার পদ যাবে।

৬৬ অনুচ্ছেদে আইনের অস্পষ্টতার মধ্যে সংবিধান সমাধানের পথের কথা বলছে। ৭০ অনুচ্ছেদ বা পদের বৈধতা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা শুনানির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হবে এবং ইসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

পদ হারানোর পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি

দলের বহিষ্কারাদেশের ভিত্তিতে এমপি পদ বহাল থাকবে কি না- তা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের মধ্যে দ্বিমুখী মত সামনে এসেছে।

আপিল বিভাগের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ আহসানুল করিম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, তার সংসদ সদস্য পদ আর থাকা উচিত নয়। মূল বিষয়টি হলো—নির্দিষ্ট ওই দলে তার সদস্যপদ আছে কি নেই। সে নিজে পদত্যাগ করুক বা দল তাকে বহিষ্কার করুক, ফল কিন্তু একই দাঁড়ায়। পূর্বে লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনার ক্ষেত্রে আক্ষরিক ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছিল যে, সংবিধানে সরাসরি ‘পদত্যাগ’ ও ‘ফ্লোর ক্রসিং’-এর কথা বলা থাকলেও ‘বহিষ্কার’-এর কথা বলা নেই। সেই যুক্তিতে তাকে স্বতন্ত্র হিসেবে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে তিনি পদত্যাগ করায় পদটি শূন্য হয়ে যায়। তবে ব্যবহারিক দিক থেকে দল ত্যাগ করা আর বহিষ্কৃত হওয়া—দুটিই পদ হারানোর ক্ষেত্রে একই বার্তা দেয়।

Gazi21
নারী কেলেঙ্কারিতে পদ হারালেন প্রবীণ জামায়াত নেতা। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী হাবিবুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, নৈতিক স্খলন হয়েছে কি না এবং তা ফৌজদারি অপরাধ কি না—তা নির্ধারণ করার একক এখতিয়ার একমাত্র ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের, কোনো রাজনৈতিক দল বা ইসি’র নয়। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী আদালত কর্তৃক দুই বছরের সাজা না হলে কেবল পার্টির সিদ্ধান্ত দেখে ইসি কোনো এমপির পদ বাতিল করতে পারে না। ফলে এই মুহূর্তে ইসির সরাসরি হস্তক্ষেপ করার আইনি সুযোগ বেশ সীমিত।

জামায়াতের শক্তি কমল, স্বতন্ত্র এমপি ৯ জন

দল থেকে বহিষ্কার হলেও সংসদীয় আইন অনুযায়ী পরবর্তী আদেশ না হওয়া পর্যন্ত গাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। সংবিধানের ৬৭(২) অনুচ্ছেদ মতে, সংসদীয় কোনো পদের আইনি জটিলতা উঠলে তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির কাছে যেতে পারে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনের পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে যতক্ষণ না তা হচ্ছে, ততক্ষণ গাজী নজরুল তার সংসদীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।

আরও পড়ুন

গাজী নজরুলের বিষয়ে ইসিকে জানাবে জামায়াত

সংসদ সচিবালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সংসদে নির্বাচিত ৭ জন ও সংরক্ষিত নারী আসনের ১ জনসহ মোট ৮ জন স্বতন্ত্র এমপি রয়েছেন। নতুন এই সাংবিধানিক মারপ্যাঁচে গাজী নজরুল যুক্ত হওয়ায় সংসদে স্বতন্ত্র এমপির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯ জনে।

এই প্রশাসনিক জট বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, দল থেকে কোনো চিঠি এখনো জাতীয় সংসদে এসে পৌঁছায়নি। বিষয়টি যেহেতু জটিল সাংবিধানিক ব্যাখ্যার বিষয়, তাই চিঠি পাওয়ার পর আমরা আইনি কাঠামোর প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ নেব।

বিইউ/এমএইচএইচ/আরএনবি/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর