১৭ জুন ২০২৬, ০৯:৫৩ পিএম
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রামে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিনী রানীকে (৭) হত্যার ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাতে আদিতমারী থানায় নিহত শিশুর বাবা নলিনী মোহন বর্মণ বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বিধান চন্দ্র বর্মণকে (২০)। এছাড়া তার বাবা রনজিত কুমার বর্মণ (৪২) ও মা মমতা রানীকেও (৩৭) আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ ইতোমধ্যে বিধান চন্দ্র ও তার বাবা রনজিত কুমারকে গ্রেফতার করেছে। অপর আসামি মমতা রানী পলাতক রয়েছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদিতমারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আইয়ুব তুহিন জানান, বুধবার দুপুরে গ্রেফতার দুই আসামিকে লালমনিরহাট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় প্রধান আসামি বিধান চন্দ্র ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে এবং তার বাবাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানায়, বুধবার বিকেলে ঘটনাস্থলের ভুট্টাখেত থেকে একটি কোদাল উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মরদেহ মাটিচাপা দিতে ওই কোদাল ব্যবহার করা হয়েছিল।
এসআই তুহিন বলেন, ‘শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তবে হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।’
পুলিশের দাবি, প্রধান আসামি বিধান চন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রায় দুই মাস আগে নিহত শিশুর পরিবার ও আসামির পরিবারের মধ্যে জমিতে সেচের পানি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে গ্রামে সালিশও হয়েছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই প্রতিশোধমূলকভাবে নন্দিনীকে হত্যা করা হয়েছে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে আসামি।
আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজিব বলেন, ‘আসামির দেওয়া তথ্য গুরুত্ব সহকারে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে প্রতিটি তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল ৪টার দিকে নন্দিনী খেলতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরদিন মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাখেত থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধান আসামি বিধানের বাড়িতে হামলা চালায়। ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে তিনটি টিনশেড ঘর এবং আসবাবপত্র পুড়ে যায়।
পরে গ্রেফতারকৃত আসামিকে জনতার সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা হলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে ১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। এ সময় পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ ছয়টি সরকারি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
নিহত নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহন বর্মণ বলেন, ‘ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার দিকে মেয়ের মরদেহ বাড়িতে আনা হয়। পরে স্থানীয় শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। আমার বিশ্বাস, হত্যার আগে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে সবকিছু পরিষ্কার হবে।’ তিনি জানান, প্রায় দুই মাস আগে আসামির পরিবারের সঙ্গে সেচের পানি নিয়ে তাদের বিরোধ হয়েছিল।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নন্দিনী হত্যা মামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে মামলার চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পুলিশ সুপার বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা এবং সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/ক.ম