১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রোগনির্ণয় যন্ত্র বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকায় চিকিৎসা সেবায় মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের ২৬টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ২৪টি, তিনটি সিটি স্ক্যান মেশিনের মধ্যে দুটি, তিনটি এমআরআই মেশিনের মধ্যে দুটি এবং ১৩টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ১০টি অচল রয়েছে। ফলে প্রতিদিন হাজারো রোগীকে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। রোগীরা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।
রোববার (১৪ জুন) দুপুরে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের নেতৃত্বে তিন সংসদ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে এমন চিত্র দেখতে পান।
পরিদর্শনদলে আরও ছিলেন রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান।
পরিদর্শনের সময় সংসদ সদস্যরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ কক্ষ ঘুরে দেখেন। এ সময় দেখা যায়, বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক কক্ষেই ধুলোবালি ও ময়লা জমে রয়েছে, কোথাও কোথাও দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের জানায়, অচল এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ২০টি মেরামতের অযোগ্য। এছাড়া দুটি সিটি স্ক্যান, দুটি এমআরআই এবং আটটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও মেরামতযোগ্য নয়।
রোগী ও স্বজনরা জানান, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রায়ই তাদেরকে হাসপাতালের বাইরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে। দিনাজপুর থেকে আসা এক রোগী বলেন, চিকিৎসক পরীক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু হাসপাতালে মেশিন সচল না থাকায় বাইরে যেতে বলা হয়েছে। অনেকেই টাকা জোগাড় করতে না পেরে পরীক্ষা করাতেই পারছেন না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে সেবা নিতে আসেন। প্রয়োজনীয় জনবল ও সচল যন্ত্রপাতির অভাবে হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ এর সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রংপুর অঞ্চলের আট জেলার মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় তদারকির অভাবে হাসপাতালের সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, জনবল সংকটের কারণে অনেক মেশিন সঠিকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সুযোগে একটি দালালচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আমরা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কাজ করছি। হাসপাতালের সার্বিক সমস্যার বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি।
রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, স্বাস্থ্যখাতের সমস্যা শুধু রংপুরের নয়, এটি সারাদেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। তিনি হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত ও জনবল সংকট সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের পর ধাপে ধাপে এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন, রংপুর বিভাগের মানুষের চিকিৎসাসেবার বর্তমান চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। আমি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে রংপুরে এসে নিজ চোখে পরিস্থিতি দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।
এদিকে শনিবার রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকের ওপর হামলা ও পরে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মরদেহ আটকে রেখে মৃত ব্যক্তির ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনাও পরিদর্শনকালে আলোচনায় আসে। এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে সংসদ সদস্যরা বলেন, চিকিৎসা সেবার সঙ্গে মানবিক আচরণ ও পেশাগত নৈতিকতা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ক.ম/