নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ জুন ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম
জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসান পুলিশি হেনস্থা ও মারধরের শিকার হওয়ার পর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে এখন চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানার ফরিদার পাড়ার বাড়িতে রয়েছেন। তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। সারা রাত থানায় কাটাতে হয়েছে তাকে ও স্বজনদের।
শনিবার (১৩ জুন) ভোররাতের দিকে তিনি ছাড়া পান। এরপর তাকে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন নাঈম হাসান। এই তথ্য নিশ্চিত করেন নাঈম হাসানের বড় ভাই মো. সাব্বির।
শুক্রবার রাতে কী ঘটেছিল নাঈম হাসানের সঙ্গে তার বিবরণ দেন সাব্বির হাসান। তিনি জানান, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে নাঈম হাসান শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ওঠেন। তিনি প্রিমিয়ার লিগ খেলে ঢাকা থেকে বিমানযোগে চট্টগ্রাম আসেন।
তার অটোরিকশাটি ফ্লাইওভার থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশ সংকেত দেয়। নাঈমের ভাষ্যমতে, পুলিশ কোনো ধরনের পরিচয় না দিয়ে নাঈমকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। অটোরিকশা চালকের কাছ থেকে গাড়ির ডকুমেন্ট ছিনিয়ে নেন। একপর্যায়ে তারা গলা চেপে ধরে নাঈমকে জোর করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলার চেষ্টা করে।
নাঈম তাকে কেন হেনস্থা করা হচ্ছে জানতে চাইলে পুলিশ আরও ক্ষিপ্ত হয়, তখন নাঈমকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। সেখানে দুইজন পুলিশ সদস্য ছিলেন বলে পরে জানতে পারি। তাদের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি পরা আরেকজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি নাঈমকে মারধর করেন। এতে গুরুতর জখম হয় নাঈমের শরীরে।
নাঈম ফোনে বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে পুলিশ আরও ক্ষিপ্ত হয়। তখনও নাঈমের গলা চেপে ধরে পুলিশ। নাঈম চিৎকার করলে আশপাশের মানুষজন জড়ো হতে শুরু করেন। প্রায় একশ’ থেকে দেড়শ’ মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। অনেকেই পরিচয় জানার পর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন।
নাঈম নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আইডি কার্ড দেখায়। তারপরও তারা নাঈমকে আসামি বলে সম্বোধন করে এবং কথা বলতে নিষেধ করে। পরে পুলিশ আরেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে নাঈমকে বলা হয়, নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে। পরে কারো ফোন আসার পর তাদের আচরণ বদলে যায় এবং নাঈমকে বসতে বলা হয়।
ক্রিকেটার নাঈম বলেছেন মানুষ আমাকে চিনত বলে আমি বেঁচে গেছি। আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকতেন, তাহলে তার কী হতো? তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হতো, সেটি কেউ জানত না। একজন সাধারণ নাগরিক যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেই নিরাপদ না থাকেন, তাহলে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়।
নাঈমের বাবা মাহবুব আলম জানান, পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে আমি দ্রুত থানায় আসি। ডিউটি অফিসার আমারে প্রথমে থানাতেই ঢুকতে দেননি। দূরে গিয়ে বসতে বলেন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে থানায় ঢুকতে দেয়। থানায় এসে পরিচয় দেওয়ার পরও আমার ছেলেকে অপমান করে কথা বলেছেন ওসি। পরে ঢাকা থেকে তামিম ইকবাল, ইসরাফিল খসরুর ফোন পেয়ে পুলিশ নমনীয় হয় এবং ভুল স্বীকার করে। পুলিশের এমন ঘটনায় নাঈম হতবাক ও কিছুটা বিপর্যস্ত। নাঈমের বাবা মাহবুব আলম বিএনপি নেতা, তিনি একসময় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি চান তিনি।
শ্যালক আবেশ খান বলেন, পুলিশ তল্লাশি করতেই পারে। কিন্তু ব্যাগ তল্লাশি না করে শারীরিকভাবে হেনস্থা কোনোভাবে কাম্য নয়। চোরাচালানের কিছু যদি থেকেই থাকে তাহলে ওই ব্যাগ নাঈমকে বহনকারী সিএনজিতে রেখে আরেকটি সিএনজিতে কেন নাঈমকে থানায় নিয়ে গেল?
আবেশ জানান, পুলিশকে ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। পুলিশকে সে আইডি কার্ডও দেখিয়েছে। সবকিছু দেখানোর পরেও সিএনজিওয়ালার কথাও পুলিশ শুনতে নারাজ। নাঈমের গলা চিপে ধরা হয়েছে; অন্য সিএনজিতে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নাঈমকে বহনকারী সিএনজিওয়ালাও শেষপর্যন্ত থানায় ছিল। তিনিও পুলিশের হেনস্থার বর্ণনা দিয়েছেন।
আবেশ প্রশ্ন করেন, পুলিশের সঙ্গে সিভিল পোশাকে একজন ছিল। ওই ব্যক্তিও লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করে। জনগণ তাকে ধাওয়া করেছিল। পরে ওই ব্যক্তি আবার থানায় গেছে। এসআইদের সঙ্গে তার যদি কোনো কানেকশন না থাকে তাহলে সে থানায় কীভাবে যায়।
আবেশ বলেন, আমরা আইনের প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী। তাই মামলা করেছি পুলিশের বিরুদ্ধে। তিনজনকে আসামি করেছি আমরা। তারা হলেন এসআই শফিক, কনস্টেবল রাসেল ও সোহেল। এই ঘটনায় পুলিশের এস আই (নিরস্ত্র) শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ। তিনি বলেন, তিনজন নয়, দুই পুলিশ জড়িত নাঈমকে হেনস্থার ঘটনায়। দু’জনকে সাসপেন্ড করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এই ঘটনার পর শনিবার দুপুর ১২টার দিকে নাঈম হাসানের বাসায় গেছেন পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী। এ সময় তিনি নাঈম ও তার বাবা মাহবুব হাসানের সঙ্গে কথা বলেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির আশ্বাস দেন।
প্রতিনিধি/এফএ