শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বিদেশে মানবপাচারের ফাঁদে প্রাণ গেল সানোয়ারের, এক মাসেও ফেরেনি মরদেহ

জেলা প্রতিনিধি, রংপুর
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

বিদেশে মানবপাচারের ফাঁদে প্রাণ গেল সানোয়ারের, এক মাসেও ফেরেনি মরদেহ
সানোয়ার হোসেন

‘আমাকে তোমরা বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে” এভাবেই আইভরি কোস্ট থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফোনে পরিবারের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন রংপুরের পীরগাছার সানোয়ার হোসেন। তার ও পরিবারের স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরাবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

উল্টো অভিযোগ উঠেছে, চাকরির প্রলোভনে আইভরি কোস্টে গিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। একই ঘটনায় কোনোমতে প্রাণে বেঁচে দেশে ফিরেছেন আরেক ভুক্তভোগী জব্বার মিয়া। তার অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের নির্যাতনে তার চোখের সামনেই মারা যান সানোয়ার হোসেন।


বিজ্ঞাপন


সানোয়ার হোসেন প্রায় ১০ বছর ধরে ভ্যান চালিয়ে এবং ছোট পরিসরে ভাঙারির ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। পরিবারে স্ত্রী, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে জুনাইদ (১২) ও বিবাহিত মেয়ে আফরিন (১৮) রয়েছেন।

স্বজনদের দাবি, সংসারের অভাব-অনটন দূর করে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়েই তিনি বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়।

এজাহার ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পশুয়া টাঙ্গাইলপাড়া এলাকার আব্দুর রহমান মিয়া এবং তার ছেলে জাইদুর রহমান ওরফে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আইভরি কোস্টে লোক পাঠানোর কথা বলে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তারা দাবি করতেন, তাদের মাধ্যমে অনেকেই বিদেশে গিয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাদের এমন আশ্বাসে এবং তাদের কথা বিশ্বাস করে কাউনিয়া উপজেলার গোড়াই গ্রামের জব্বার মিয়া এবং পীরগাছা উপজেলার পশুয়া খাঁপাড়া গ্রামের সানোয়ার হোসেন বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মানবপাচারকারীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রহমান ট্রেডার্সে দুজনের জন্য ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ থেকে রওনা হয়ে পরদিন আইভরি কোস্টে পৌঁছান সানোয়ার ও জব্বার। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর চাকরি নয়, অপেক্ষা করছিল ভিন্ন এক বাস্তবতা।

অভিযোগ রয়েছে, কুমিল্লা অঞ্চলের ‘রাজু’ নামে এক দালাল বিমানবন্দর থেকে তাদের গ্রহণ করে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির অন্ধকার কক্ষে তাদের আটকে রাখা হয়। ওই বাড়িতে আগে থেকেই কয়েকজন বাংলাদেশি দালাল অবস্থান করছিল। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীদের কাজ না দিয়ে বরং শুরু হয় জিম্মি করে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের কাছে ফোন করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন


পরিবারের সদস্যরা জানান, সানোয়ার ও জব্বারকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন স্বজনরা। নিরুপায় হয়ে সানোয়ারের বড় ভাই মনু মিয়া এবং পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন বিকাশ নম্বর ও ব্যাংক হিসাবে আরও আট লাখ টাকা পাঠান। স্বজনদের আশা ছিল, টাকা পাঠানোর পর হয়তো তাদের মুক্তি মিলবে কিংবা কাজের ব্যবস্থা হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হলে গত ১৬ এপ্রিল মূল অভিযুক্ত আব্দুর রহমান মিয়া নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদন করেন। যা ছিলো সময়ক্ষেপণের কৌশল।

মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আইভরি কোস্ট থেকে পরিবারের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেন সানোয়ার। পরিবারের সদস্যরা জানান, ফোনের ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সানোয়ার বলেছিলেন, ‘আমাকে তোমরা বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ এরপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে যায়। কিছুদিন পর আসে মৃত্যুর খবর। অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একপর্যায়ে গত ২২ এপ্রিল আইভরি কোস্টে মারা যান সানোয়ার হোসেন।

একই ঘটনায় কোনোমতে প্রাণে বেঁচে জব্বার মিয়া গত ৫ জুন দেশে ফেরেন। দেশে ফিরেই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। চিকিৎসা শেষে থানায় দেওয়া অভিযোগে জব্বার মিয়া দাবি করেন, আইভরি কোস্টে তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে এবং তার চোখের সামনেই সানোয়ার হোসেন মারা গেছেন।

জব্বার মিয়া বলেন, তারা আমাদের অসহায়ত্বের সুযোগে টাকা নিয়ে আইভরি কোস্টে পাচার করেছে। সেখানে কাজের ব্যবস্থা না করে আটকে রেখে নির্যাতন করেছে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে আমার চোখের সামনে সানোয়ার মারা যায়। আমি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

মরদেহের অপেক্ষায় পরিবার

সানোয়ার হোসেনের মৃত্যুর প্রায় এক মাস হলেও এখনও দেশে ফেরেনি তার মরদেহ। পরিবারের সদস্যরা জানান, মরদেহ এখনও আইভরি কোস্টেই রয়েছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। দূতাবাসের সঙ্গেও কার্যকর যোগাযোগ করতে পারেননি তারা।

এদিকে, স্বামীকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন হাজেরা বেগম। তিনি বলেন, আমার স্বামী ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাত। ভালো থাকার আশায় বিদেশে গিয়েছিল। এখন আমি শুধু আমার স্বামীর লাশটা দেশে ফেরত চাই। যারা আমার স্বামীর সর্বনাশ করেছে, তাদের বিচার চাই।

বাবার মৃত্যুর বিষয়টি এখনও মেনে নিতে পারছে না পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে জুনাইদ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে তারা। আমি শুধু একবার বাবার মুখটা দেখতে চাই।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে আব্দুর রহমান মিয়ার ছেলে জাইদুর রহমান ওরফে রিয়াদ সানোয়ার হোসেন এবং জব্বার মিয়াকে আইভরি কোস্টে পাঠানোর কথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি আপস মীমাংসার আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে আগামী সোমবার পীরগাছা থানায় বসা হবে। সেখানে বিষয়টির মীমাংসা হবে।

পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম খন্দকার মহিব্বুল ইসলাম মুন বলেন, এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর এজাহার গ্রহণ করা হয়েছে। তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অবশ্যই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর