images

সারাদেশ

কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরলেন লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার ২ প্রবাসী

জেলা প্রতিনিধি

০৭ জুন ২০২৬, ০১:৩০ পিএম

প্রিয়জনেরা অপেক্ষা করেছিলেন জীবিত ফিরে আসবেন বলে। কেউ ভেবেছিলেন ঈদে বাড়ি আসবেন, কেউবা আশা করেছিলেন আবার ফোনে কথা হবে। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো কফিনবন্দি হয়ে। লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের মরদেহ দেশে ফিরেছে কফিনবন্দি হয়ে। তাদের নিথর দেহ গ্রামে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

রোববার (৭ জুন) সকালে মরদেহ দুটি নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।

এর আগে শনিবার (৬ জুন) গভীর রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় তাদের মরদেহ। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

গত ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় নিজ আবাসস্থলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের মো. নাহিদুল ইসলাম (২০)। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের মরদেহ দেশে আনা হলো।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু জানান, শনিবার রাতে বিমানবন্দরে সরকারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে সেগুলো নিজ নিজ গ্রামের উদ্দেশে পাঠানো হয়। রোববার জোহরের নামাজের পর তাদের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

f27d953f-44eb-4608-8f83-3896e77f6fe4

শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন পরিবারের সদস্যরা। ১৮ বছরের সংসার গড়ে তুলেছিলেন তিনি। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী রুমা খাতুন এবং দুই কন্যাসন্তানকে ঘিরেই ছিল তার স্বপ্ন।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন শফিকুল। তার পাঠানো অর্থেই চলত পুরো সংসার। সেই মানুষটিকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় পরিবারটি। বড় মেয়ে মৌ আক্তার বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর তার পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, শফিকুলের আয়েই পুরো পরিবারটি চলত। তার মৃত্যুতে পরিবারটি কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছে। পরিবারের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, অন্তত তার বড় মেয়ের জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।

আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামেও একই চিত্র। মাত্র ২০ বছর বয়সে পরিবারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন নাহিদুল ইসলাম। স্বজনদের আশা ছিল বিদেশে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই ফিরেন কফিনবন্দি হয়ে।

মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর মা, বাবা ও স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। প্রতিবেশীরাও শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কান্না থামানো সম্ভব হয়নি।

b347b589-4d77-4611-b895-2f22bb86ec0a

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, খুলনার সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান জানান, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দাফন-কাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, দুই প্রবাসীই বৈধভাবে বিদেশে গিয়েছিলেন। ফলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে তিন লাখ টাকা এবং জীবন বীমার আওতায় এককালীন ১০ লাখ টাকা পাবেন। অর্থাৎ প্রত্যেক পরিবারের জন্য মোট ১৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা নির্ধারিত রয়েছে।

তিনি আরও জানান, একই ঘটনায় আহত প্রবাসী শুভজিৎও নিয়ম অনুযায়ী সরকারি সহায়তা পাবেন। সরকারি আর্থিক সহায়তা হয়তো কিছুটা আর্থিক সংকট লাঘব করবে। কিন্তু পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো অর্থেই পূরণ হওয়ার নয়।

প্রতিনিধি/টিবি