images

সারাদেশ

‘মা’ শব্দের জীবন্ত উদাহরণ, ছেলেকে বাঁচাতে কিডনি দিলেন শিক্ষিকা মা

জেলা প্রতিনিধি

১০ মে ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম

মা মানেই আশ্রয়, মা মানেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। সন্তানের কষ্ট নিজের বুকে নিয়ে হাসিমুখে পথ চলার আরেক নাম মা। পৃথিবীর ইতিহাসে অসংখ্য আত্মত্যাগের গল্প থাকলেও, নিজের শরীরের একটি অঙ্গ কেটে সন্তানের শরীরে বসিয়ে তাকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা সবসময়ই মানুষকে নাড়া দেয় গভীরভাবে। এবার তেমনই এক হৃদয়স্পর্শী দৃষ্টান্ত গড়েছেন শরীয়তপুরের জাজিরা পৌরসভার উত্তর বাইকশা এলাকার শিক্ষিকা নাসিমা সুলতানা।

বিশ্ব মা দিবসেই নিজের ছেলে নাসিম জাহান আকাশের জীবন বাঁচাতে একটি কিডনি দান করেছেন তিনি। আর এই আত্মত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মা-ছেলের জন্য দোয়া আর ভালোবাসার বার্তায় ভরে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় নয় মাস আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আকাশ। প্রথমে সাধারণ শারীরিক জটিলতা মনে হলেও পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে ভয়াবহ সত্য—তার দুটি কিডনিই প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। সেই খবর যেন মুহূর্তেই বদলে দেয় পুরো পরিবারের জীবন।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ হাসপাতাল জীবন। একের পর এক ডায়ালাইসিস, চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, ওষুধ আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে কাটতে থাকে দিন। পরিবারের সদস্যরা যখন দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ছিলেন, তখনই সবচেয়ে বড় সাহস হয়ে দাঁড়ান মা নাসিমা সুলতানা।

467f4c02-5b86-48c8-917b-5f99d6f6ab9b

একজন মা হিসেবে সন্তানের কষ্ট তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই কোনো দ্বিধা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেন নিজের একটি কিডনি ছেলেকে দান করবেন। চিকিৎসকদের সব ধরনের পরীক্ষায় উপযুক্ত দাতা হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি।

নাসিমা সুলতানা স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের মানুষ গড়ার কাজে নিয়োজিত। শ্রেণিকক্ষে তিনি যেমন শত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন, তেমনি নিজের সন্তানকে বাঁচাতে দেখালেন মমতা, সাহস আর আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

রোববার (১০ মে) বিশ্ব মা দিবসে ঢাকায় মা-ছেলের কিডনি প্রতিস্থাপন অপারেশন সম্পন্ন হয়। অপারেশনটি পরিচালনা করেন দেশের খ্যাতিমান কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ও ইউরোলজিস্ট ডা. মো. কামরুল ইসলাম। তিনি ঢাকার সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মানবিক চিকিৎসাসেবা ও স্বল্প খরচে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে প্রশংসিত।

আরও পড়ুন

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা এবং বয়স্ক মায়েদের বৃদ্ধাশ্রমে দেওয়ার প্রবণতা

অপারেশনের আগে আবেগাপ্লুত হয়ে আকাশের বড় বোন বৃষ্টি বলেন, আমার ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে মা নিজের শরীরের একটি অংশ দিয়ে দিচ্ছেন। এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। পৃথিবীতে মায়ের মতো আপন আর কেউ হয় না। মা দিবসে আমাদের পরিবারের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় অনুভূতি।

স্থানীয় বাসিন্দা আকিব হাসান বলেন, অনেক মায়ের গল্প শুনেছি, কিন্তু নিজের সন্তানের জন্য এভাবে কিডনি দান—এটা সত্যিই বিরল ঘটনা। শুনে চোখে পানি চলে এসেছে।

f49e2cbc-8b53-40b1-b2b5-e0ab539d5300

জাজিরা উপজেলার শিক্ষক সমাজের সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, নাসিমা ম্যাডাম একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আজ তিনি যা করলেন, তা একজন মায়ের ভালোবাসাকে নতুনভাবে সামনে এনে দিয়েছে। এই ঘটনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

স্থানীয় তরুণ সমাজকর্মী জাহিদ হাসান বলেন, মা দিবসে আমরা অনেক আবেগঘন পোস্ট দেখি। কিন্তু একজন মা নিজের শরীরের অঙ্গ দান করে সন্তানের জীবন বাঁচাচ্ছেন, এর চেয়ে বড় ভালোবাসা আর হতে পারে না।

এদিকে, উত্তর বাইকশা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মা ও ছেলের সুস্থতা কামনায় স্থানীয়রা দোয়া করছেন। কেউ হাসপাতালে খোঁজ নিচ্ছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের জন্য দোয়া চেয়ে পোস্ট দিচ্ছেন। পুরো এলাকায় যেন এক অদ্ভুত আবেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সব সম্পর্কের মধ্যে মায়ের সম্পর্কই সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ও নির্মল। একজন মা সন্তানের জন্য নিজের সুখ-স্বপ্ন, এমনকি নিজের শরীরও উৎসর্গ করতে পারেন। শরীয়তপুরের এই ঘটনাটি যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই আরেকটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

বিশ্ব মা দিবসে এই আত্মত্যাগের গল্প মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের নাম ‘মা’, আর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নামও ‘মা’।

প্রতিনিধি/এসএস