জেলা প্রতিনিধি
১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়মের জড়িয়ে তুমুল বিতর্কের মুখে চাকরির মেয়াদ শেষ করেই বিদায় নেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. খালেকুজ্জামান। তার চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ দিন ধরে মহাপরিচালকের পদটি শূন্য রয়েছে। দেওয়া হয়নি কাউকে ভারপ্রাপ্তের দায়িত্বে। ফলে মহাপরিচালক বিহীন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতনসহ প্রয়োজনীয় ফাইল অনুমোদনে মহাপরিচালকের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। কিন্তু পদ শূন্য থাকায় কোন কাজই স্বাভাবিক গতিতে চলছে না। ফলে অনেকটা খুঁড়িয়ে চলছে দৈনন্দিন কার্যক্রম।
জানা গেছে, গত ২ এপ্রিল ছিল বিদায়ী মহাপরিচালক মো. খালেকুজ্জামানের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে শেষ কর্ম দিবস। গত ৪ এপ্রিল তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যান। তিনি অবসরে যাওয়ার পরপরই মহাপরিচালকের পদটি শূন্য হয়ে যায়। সেখানে নতুন কাউকে নিয়োগ করার বিধান থাকলেও শনিবার (১৮ এপ্রিল) পর্যন্ত গত ১৫ দিনে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ভারপ্রাপ্ত হিসেবেও কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে চলছে চরম অস্থিরতা। দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক জটিলতাও।
দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, সদ্য অবসরে যাওয়া মহাপরিচালক ড. মো. খালেকুজ্জামানই এ অস্থিরতা সৃষ্টি করে গেছেন। মহাপরিচালকের শূন্যপদে নিয়োগ পেতে অন্তত ১০ কর্মকর্তা দৌড়ঝাঁপ করছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয়ে পদোন্নতি পেয়েছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্রি’র একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে রাজনীতি ঢুকে গেছে। ফলে গবেষণার প্রতি নজর না দিয়ে বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ পদ ও পদোন্নতি পেতেই বেশি আগ্রহী। এ জন্য বিভিন্ন জায়গায় তদবীরও চালাচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে মহাপরিচালকের পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
অন্য আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ব্রিতে কর্মরত এমন কাউকে না দিয়ে মহাপরিচালকের পদটি বাইরের কাউকে দিলে পরিচালনা ভালো হবে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ড. খালেকুজ্জামান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেন কর্মকর্তা কর্মচারি ও বিজ্ঞানীরা। ৭ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে সুজা মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে প্লামার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অথচ শেরপুরের শ্রীবরদী থানার কুকড়াপাড়া গ্রামের ফজলুল হক মিয়ার ছেলে সুজা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশই নেননি। ভাইভা কিংবা ব্যবহারিক পরীক্ষার ধারে কাছেও যাননি। অথচ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) প্লামার পদের নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে দিব্যি যোগদান করতে যান ব্রি’তে। জালিয়াতি আর প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে যোগদান করতে যাওয়া সুজা মিয়া ধরা পড়েন কর্তৃপক্ষের হাতে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে ধরার পড়ার পরদিন আদালতের মাধ্যমে সুজা মিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পরার পর সুজা মিয়া দাবি করেছিলেন, এই নিয়োগের জন্য তিনি সাত লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। তবে কার কাছে দিয়েছেন সেটা বলেননি। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ক্যাম্পাসে হইচই শুরু হয়। বিক্ষোভ করতে থাকেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা এ ঘটনার জন্য বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে মহাপরিচালককে দায়ী করেন। ওই সময় ৭৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেসময় এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন বিজ্ঞানীরা।
কর্মকর্তারা জানান, ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনো বিভাগীয় প্রধানকে রাখা হয়নি। একটি সিন্ডিকেট করে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন বিদায়ী মহাপরিচালক। মহাপরিচালক ড. মো.খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওই বিক্ষোভ করেন তারা। এতে বিজ্ঞানী সমিতির সভাপতি ড. মো. ইব্রাহিম, সাধারণ সম্পাদক ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রশীদ তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ রমজান আলী,শ্রমিক সমিতির সভাপতি লুৎফর রহমান, আলমগীর হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান ও ডিপ্লোমা কৃষিবিদ সমিতির মনির হোসেন বক্তব্য রাখেন।
ব্রি’র কর্মকর্তারা বলেন, ড. খালেকুজ্জামান ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে ব্রি’কে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে গেছেন। এছাড়াও ড. মো. খালেকুজ্জামান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে গবেষণা বিভাগ ভিত্তিক পদোন্নতির পরিবর্তে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনে পদোন্নতি দেওয়ার নীতি অবলম্বন করেছিলেন। হঠাৎ করে সেই নীতিমালা উপেক্ষা করে ‘এন্টিডেটেড সিনিয়রিটি’ বা পশ্চাদ-তারিখ ভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। এতে ফুঁসে ওঠেন ব্রি’তে কর্মরত প্রায় ৩শ বিজ্ঞানী। ২০০৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত ব্রি’র ২৯তম সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে মহাপরিচালক নিচের নিয়ম জারি করেন।
বিভাগ ভিত্তিক ব্যবস্থায় পদোন্নতি বহাল রাখার দাবিতে আইনি নোটিশও পাঠানো হয়। এতে বিদ্যমান নীতিমালা উপেক্ষা করে দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধের আহবান জানানো হয়েছে। ২৪ মার্চ ব্রি উদ্ভিত প্রজনন বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী কল্যাণ কুমার সাহা ওই নোটিশ করেন। নোটিশে ব্রি’র মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান, উপ-সচিব ইসরাত জাবিন, অতিরিক্ত সচিব মো. আলমগীর হোসেন, যুগ্ম সচিব আবু হেনা মো. মোস্তফা কামালসহ ব্রি’র বোর্ড অব ম্যানেজম্যান্ট ও বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি-১ এর ১৩ জন সদস্যকে বিবাদী করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, ব্রি’তে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের পদোন্নতি দেওয়া হয়ে আসছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা ও গবেষণাভিত্তিক বিশেষায়নের সমন্বয়ে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রমও বিভাগভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই ব্রি’ দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ‘এন্টিডেটেড সিনিয়রিটি’ বা পশ্চাদ-তারিখ ভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের একটি অংশের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান গবেষণা কাঠামো ও জনবল ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থায় আইনজীবী কল্যাণ কুমার সাহার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) উদ্ভিত প্রজনন বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ব্রি’র মতো একটি জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি ব্যবস্থা বহাল রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক কৃষি গবেষণা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচকভাবে পড়তে পারে। এ বিষয় চিন্তা করে তিনি আইনি নোটিশ করেছেন।
শ্রমিকদের বিক্ষোভ, কার্যালয় ঘেরাও: গত ৩১ মার্চ ব্রির কৃষি শ্রমিকদের ওভারটাইম (অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক) বন্ধসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। এ সময় শ্রমিকরা মহাপরিচালকের দপ্তর ঘেরাও করে রাখেন।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানান, ব্রি প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৫৫ বছর ধরে শ্রমিকদের ওভারটাইম প্রদানের একটি নিয়মিত প্রথা চালু ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন মহাপরিচালক ড. মো. খালেকুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ওই প্রথা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং বহিরাগত শ্রমিক এনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে কাজ করানো হচ্ছে।
শ্রমিকদের দাবি, নিয়মিত শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করানোর পরিবর্তে ব্রি মহাপরিচালক খামার বিভাগের সঙ্গে যোগসাজশে বহিরাগত ও অনভিজ্ঞ শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। এতে একদিকে নিয়মিত শ্রমিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছেন তারা।
তারা আরও জানান, প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত তাদের নিয়মিত কর্মঘণ্টা। এরপর বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ওভারটাইম হিসেবে অতিরিক্ত কাজ করতেন। দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরির পাশাপাশি অতিরিক্ত ৪ ঘণ্টার জন্য ৩০০ টাকা পেতেন, যা তাদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু ওভারটাইম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে।
এসব বিষয়ে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. খালেকুজ্জামানের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে রেখেছেন।
প্রতিনিধি/টিবি