উপজেলা প্রতিনিধি
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৩ পিএম
ঢাকার দোহার উপজেলায় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এ সময়টাতে তীব্র বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের জন্য জনজীবনে নেমে এসেছে বিপর্যয়। প্রতিদিনই বাড়ছে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা। আবাসিক থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবখানেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দোহার পল্লিবিদ্যুৎ অফিসের দাবি, গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় এ ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তাপমাত্রা কমে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের কথা বলছেন তারা।
এ উপজেলায় ঢাকা পল্লীবিদ্যুতের অধীনে প্রায় ৮৫ হাজার গ্রাহক সেবা গ্রহণ করে থাকে। বর্তমানে এখানে প্রতিদিন ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলে সরবরাহ পাচ্ছে অর্ধেকের কম। যে কারণে ২৪ ঘণ্টায় এলাকাভিত্তিক ১২ ঘণ্টারও কম সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে। একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কাজকর্মে সময় মতো বিদ্যুৎ না পাওয়াতে ব্যাহত হচ্ছে। জনজীবনে নেমে এসেছে এক ধরনের অস্থিরতা।

লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্যাংক, ওয়েল্ডিং কারখানা, ফটোকপি মেশিন, রাইস মিল, কাপড় ইস্ত্রি, সেচ পাম্প, অনলাইন সেবা প্রতিষ্ঠান, ট্রেনিং সেন্টার মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। বিদ্যুতের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
বিদ্যুৎ অফিসের তথ্যমতে, দোহার পল্লী বিদ্যুতের ৫টি ফিডারের অধীনে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়ে থাকে। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চাহিদা মোতাবেক বিদ্যুতের সরবরাহ থাকলেও অন্য এলাকায় অতিরিক্ত লোডশেডিং হয়ে থাকে। রাইপাড়া, শিলাকোঠা ও নারিশা ফিডারে বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ অনেক পুরনো। এসব এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারাদিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। যে কারণে দুঃসহ গরম সহ্য করে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা গরমের সীমাহীন কষ্ট ভোগ করছে।

প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বিদেশগামী যাত্রীদের জনশক্তির জন্য গড়ে উঠেছে ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টার। যেখান থেকে বিদেশগামী যাত্রীরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে স্কিল নিয়ে বিদেশে যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।
এ উপজেলার কর্মরত সাংবাদিকরা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের শিকার হচ্ছেন। একটি নিউজ সম্পন্ন করতে গেলে একাধিকবার বিদ্যুতের লোডশেডিং কবলে পড়তে হচ্ছে। যে কারণে সময়মতো অফিসে নিউজ পাঠাতে পারছেন না তারা। অন্যদিকে তাড়াহুড়ো করে সংবাদ তৈরি করতে গিয়ে মানসম্পন্ন নিউজ নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
উপজেলার প্রায় ৬০টির মতো ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। যেখান থেকে প্রতি মাসেই ইন্টারভিউ দিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা। বটিয়া এলাকায় দোহার নবাবগঞ্জ টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের কর্ণধার মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে ভিয়েতনামগামী কিছু প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। সারাদিনই এখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ না থাকাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছি। যে কারণে আমাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার শংকা দেখা দিয়েছে।
অনলাইনে আবেদনের প্রতিষ্ঠান জয়পাড়া অনলাইনের মালিক এ প্রতিবেদককে জানায়, লোডশেডিং এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। দিনের বেলা ও গভীর রাতে এখন বিদ্যুৎ থাকে না। আর এজন্য কাউকে অভিযোগ দিয়ে কোনো সমাধান হচ্ছে না।

বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে শ্রমজীবী মানুষজন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ উপজেলার বহু মানুষ ইজিবাইক ও অটোরিকশা চালিকা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। রাতের বেলা সাধারণত গাড়িগুলোর ব্যাটারি চার্জ হয়ে থাকে। সময়মতো চার্জ না হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ায় তাদের আয়ে ধস নেমেছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা পল্লীবিদ্যুতের দোহার জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. বাদল মিয়া এ প্রতিবেদককে জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, ফার্নেস ওয়েল ও পেট্রোলের ব্যবহার হয়ে থাকে। যুদ্ধের জন্য এগুলো সময়মতো দেশে না আসার কারণে সংকট তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে এ ব্যাপারে আমরা কিছুই বলতে পারছি না। বিদ্যুৎ না থাকলে সবারই কমবেশি সমস্যা হয়ে থাকে এবং সরাসরি বিদ্যুতের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। প্রাকৃতিক সমস্যা হলে আমরা তা সহজেই মেনে নিই, কিন্তু যুদ্ধ যেহেতু কৃত্রিম সমস্যা, এটা সমাধান হবে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ ব্যবহারে আমাদের সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের সবার আগে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। তাহলে যে কোনো বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে আমি মনে করি।
প্রতিনিধি/এসএস