জেলা প্রতিনিধি
১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের শান্ত সবুজে ঘেরা ছয়চিরি দিঘী। বছরের বেশিরভাগ সময় নিরিবিলি থাকলেও চৈত্র মাসের শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎই বদলে যায় এই দিঘীর পাড়ের চিত্র। ঢাকের তালে, শঙ্খধ্বনির সঙ্গে উলুধ্বনি আর মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দুই শতকেরও বেশি সময় পার হলেও ছয়চিরি দিঘীর চড়ক পূজা আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও মূল আচার-অনুষ্ঠান অপরিবর্তিত রয়েছে।
জানা গেছে, ছয়চিরি দিঘীর পাড়ে বাংলা পঞ্জিকা মতে প্রতিবছরের চৈত্র সংক্রান্তিতে ৩ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে চড়ক পূজার উৎসব। এই চড়ক পূজাকে কেন্দ্র করে বসা গ্রামীণ মেলায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ছয়চিরি দিঘীর চার পাড়ের মধ্যে দিঘীর পূর্বপাড়ে ১টি, উত্তরপাড়ে ১টি এবং দক্ষিণপাড়ে ২টি চড়ক গাছ স্থাপন করে চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসব আজও তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে তা বিস্তৃত হয়ে আজকের বৃহৎ লোকউৎসবে রূপ নিয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষ এখানে সমবেত হন, যা গ্রামীণ সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ছয়চিরি দিঘীকে ঘিরেই এই পূজার সূচনা। পূজার অন্যতম আকর্ষণ দিঘি থেকে চড়ক গাছ তোলার আচার। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ে দিঘিতে ডুবিয়ে রাখা গাছ নিজে থেকেই ভেসে ওঠে, যা ভক্তদের কাছে অলৌকিক হিসেবে বিবেচিত। এমন বিশ্বাস এখনও অটুট স্থানীয়দের মনে। পরে সেই গাছকে পাড়ে স্থাপন করে শুরু হয় মূল আচার।
আলাপকালে শিবভক্ত নিত্যানন্দ মালাকার জানান, চড়ক পূজা মূলত শিবভক্তদের এক কঠোর সাধনার প্রতীক। পূজার কয়েকদিন আগে থেকেই ভক্তরা ‘সন্ন্যাস’ গ্রহণ করেন। ভক্তরা সংসার ত্যাগ করে কঠোর নিয়মে জীবনযাপন করেন এবং শিবের নামে গান গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে অনুদান সংগ্রহ করেন।
পূজার আগের রাতেই শুরু হয় আগুনের ওপর নৃত্য ‘কালীনাচ’। জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর নির্ভীক পদচারণা যেন ভক্তির এক অন্যরকম দৃশ্য তুলে ধরে। সবচেয়ে আলোচিত অংশ ‘বড়শি সন্ন্যাস’। ভক্তদের পিঠে লোহার বড়শি গেঁথে চড়ক গাছে ঝুলিয়ে ঘোরানো হয়। অনেকের কাছে এটি বিস্ময়কর, আবার ভক্তদের কাছে এটি শিবের প্রতি আত্মসমর্পণের প্রতীক।
স্থানীয়রা জানান, ছয়চিরি দিঘীর চড়ক পূজাকে কেন্দ্র করে বসা গ্রামীণ মেলাটি এলাকাবাসীর জন্য এক অনন্য মিলনমেলা। চৈত্র সংক্রান্তির এই মেলা শুধু ধর্মীয় উৎসবের অংশ নয়, বরং গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
গ্রামীণ এ মেলায় মাটির খেলনা, বাঁশ-কাঠের তৈরি হস্তশিল্প, ঘরোয়া ব্যবহার্য জিনিসপত্র-সব মিলিয়ে যেন গ্রামীণ শিল্পের এক ছোট্ট প্রদর্শনী। শিশুদের জন্য থাকে নাগরদোলা ও বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন, যা মেলায় এনে দেয় বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য। খাবারের অংশেও থাকে বৈচিত্র্য। বাতাসা, মুড়কি, জিলাপি থেকে শুরু করে স্থানীয় নানা মিষ্টান্নের স্বাদ নিতে ভিড় জমান হাজারো দর্শনার্থীরা।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই মেলা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারিগরদের জন্য এটি একটি বড় আয়ের সুযোগ তৈরি করে। আশপাশের গ্রাম থেকে আসা বিক্রেতারা তাদের পণ্য বিক্রি করে লাভবান হন, ফলে সাময়িকভাবে তৈরি হওয়া কর্মসংস্থানের সুযোগও এমনটাই জানান সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় দোকানদার রুবেল মিয়া বলেন, এই মেলা আমাদের জন্য বড় আয়ের সুযোগ। আমাদের গ্রামের ও আশপাশের অনেক লোকেরা পণ্য বিক্রি করে, শিশু-যুবকরা আনন্দ পায়। এটি শুধু ব্যবসা নয়, উৎসবের প্রাণ।
তরুণ প্রজন্মের কাছে লোকজ সংস্কৃতি পরিচিত করার সুযোগ আছে জানিয়ে শিক্ষার্থী রাতুল দাশ বলেন, ছয়চিরি দিঘীর চড়ক পূজাকে কেন্দ্র করে বসা গ্রামীণ মেলাটি শুধু আনন্দ নয়, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক শিক্ষা। শহরের মেলার সঙ্গে ভিন্ন এই গ্রামীণ মেলা। তরুণ প্রজন্ম সরাসরি আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
হাজার হাজার মানুষ এই মেলায় অংশগ্রহণ করেন। শুধু কমলগঞ্জ নয়, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসেন। অনেকেই এটিকে বার্ষিক ভ্রমণ বা পারিবারিক আড্ডার অংশ হিসেবে দেখেন।
এটি শুধু ধর্মীয় নয়, আমাদের সংস্কৃতিরও বড় অংশ জানিয়ে শচীন্দ্র প্রসাদ রায় চৌধুরীর বংশধর অঞ্জন প্রসাদ রায় চৌধুরী বলেন, এই পূজা আমি শৈশব থেকে দেখে আসছি। প্রায় দুইশত বছর আগে রাজা ধর্মনারায়ণের বংশধর শচীন্দ্র প্রসাদ রায় চৌধুরী চৈত্রসংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখে তার চার শতাধিক বছরের পুরোনো ছয়চিরি দিঘির পাড়ে প্রথম কালার্করুদ্র বা চড়কপূজা পদ্ধতির আয়োজন করেন। তৎকালীন সময় তান্ত্রিক সাধক সোন ভক্তের মাধ্যমে এই চড়কপূজা শুরু হয়। এরপর থেকে এখানে প্রতিবছর এ পূজার আয়োজন করা হয়। বর্তমানে তিন দিনব্যাপী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে অংশ নেয়, যা এলাকায় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
দুইশত বছরের বেশি সময় পার হলেও ছয়চিরি দিঘীর চড়ক পূজা আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও মূল আচার-অনুষ্ঠান অপরিবর্তিত রয়েছে। এই পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্য বলছিলেন, শহরের প্রবীণ নাগরিক শৈলেন রায়।
ছয়চিরি দিঘীর পাড়ে অনুষ্ঠিত চড়ক পূজা ধর্ম, লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতি মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য উৎসব, যা শুধু মৌলভীবাজার নয়, পুরো বাংলার ঐতিহ্যেরই প্রতিচ্ছবি। এবারও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে দর্শনার্থীর উপস্থিতি ঘটবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।
মৌলভীবাজারের কেন্দ্রীয় কালী মন্দিরের পৌরহিত কন্দর্প নারায়ণ চক্রবর্তী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বাংলা পঞ্জিকা মতে চৈত্র সংক্রান্তি দিন চড়ক পূজার আয়োজন করেন।
প্রতিনিধি/টিবি