জেলা প্রতিনিধি
০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম
রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন বলেছেন, ‘নগরীকে একটি বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরীর মধ্যে শ্যামা সুন্দরী খাল, কেডি ক্যানেল, ইছামতি, কুকরুল বিল, চিকলী বিলসহ খালগুলোকে যদি পরিকল্পিতভাবে আগামী একশ বছরের জন্য টেকসই করে সংস্কার করা যায়, তাহলেই কেবল এর সুফল নগরবাসী পাবে। সেই সঙ্গে প্রকৃতিও প্রাণ ফিরে পাবে। এজন্য সময় দরকার, সদিচ্ছা প্রয়োজন। আমি দায়িত্বে থাকাকালীন খাল সংস্কারে সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জ নিতে ইচ্ছুক রয়েছি।’
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দুপুরে নগরীর টাউন হলে তিস্তা নদী, শ্যামা সুন্দরী খাল এবং প্রাণ-প্রকৃতির পরিবেশ রক্ষায় গ্রীন ভয়েস বিভাগীয় পরিবেশ সম্মেলনের আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধান অতিথি বলেন, ‘দরিদ্র দেশের মধ্যে দরিদ্রতম সিটি হচ্ছে রংপুর সিটি। যার কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও উন্নয়ন সম্ভব হয় না। দুঃখজনক হলেও সত্যি, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রংপুর সিটির উন্নয়নে কোনো বরাদ্দ নেই। যার কারণে সিটি কর্পোরেশনের সীমিত সম্পদ দিয়ে কীভাবে গ্রীন সিটি করা যায়, সেই লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু করেছি। এজন্য আমাদের নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। নাগরিকরা সচেতন হলে এবং চাপ সৃষ্টি করলে অবশ্যই নগরবাসী তাদের প্রাপ্য অধিকার পাবে। আমি যতদিন থাকব, ততদিন প্রশাসক হিসেবে নয়, সেবক হিসেবে নগরবাসীর প্রাপ্য অধিকার নিয়ে কাজ করতে চাই।’
রসিক প্রশাসক বলেন, ‘প্রকৃতির সৌন্দর্য রক্ষায় বর্তমান প্রজন্মের বেশি ভূমিকা রয়েছে। কেননা আজকের যুবকরাই আগামী দিনের নাগরিক। তারা যত বেশি পরিবেশ নিয়ে সচেতন হবে, তারাই আগামী দিনে তত বেশি ভালো পরিবেশ উপভোগ করবে। গ্রীন ভয়েস যে যুবকদের নিয়ে পরিবেশ বিষয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছে, সেটি একসময় আমাদের নির্মল পরিবেশ উপহার দেবে। তবে তাদের পড়ালেখার পাশাপাশি এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে।’
দুর্নীতি নিয়ে প্রশাসক বলেন, ‘যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা এলাকার উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে দুর্নীতি। এই দুর্নীতি রুখতে পারলে দেশের উন্নয়ন আরও বেশি সম্ভব। তাই আজকের যুবকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে এবং নিজেদের দুর্নীতিমুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ সময় তিনি গ্রীন সিটি গড়তে পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সহযোগিতা কামনা করেন।’
গ্রীন ভয়েসের প্রধান সমন্বয়ক আলমগীর কবির বলেন, ‘১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলাকে মুক্ত করতে এবং ১৯৭১ সালে দেশকে স্বাধীন করতে বড় ভূমিকা ছিল শিক্ষার্থীদের। এই শিক্ষার্থীরাই ২০২৪ সালের গণআন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তাই আগামী দিনে একটি বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আজকের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নানা আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা জড়ালেও খুব সহসা কেউ পাখি সংরক্ষণ, নদী রক্ষা কিংবা পরিবেশ নিয়ে আন্দোলনে যুক্ত হতে চায় না। এর মধ্যেও যারা পরিবেশ নিয়ে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে, তারা অবশ্যই পরিবেশবান্ধব দেশ প্রত্যাশা করে। আমরাও বিশ্বাস করি, একদিন এই তরুণ, যুবক ও শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব দেশ গড়ে উঠবে।’
আয়োজকরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, খরা, বন্যা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে রংপুর বিভাগ বর্তমানে বহুমাত্রিক পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। নদীভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও মানবসৃষ্ট চাপ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই অঞ্চলের পরিবেশ ও জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের আহ্বানও জানানো হয়।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এই সম্মেলনের মাধ্যমে তরুণ সমাজ পরিবেশ রক্ষায় আরও সচেতন হবে এবং ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
নদী, প্রাণ ও প্রকৃতির পরিবেশ রক্ষায় রংপুরে বিভাগীয় পরিবেশ সম্মেলনের আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন- গ্রীন ভয়েসের প্রধান সমন্বয়ক আলমগীর কবির। গ্রীন ভয়েসের রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়কারী রবিউল ইসলাম রুবেলের সভাপতিত্বে রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী রংপুরের সভাপতি শ্বাশত ভট্টাচার্য, জেলা বাপার সভাপতি অ্যাডভোকেট শামীমা আক্তার শিরিন, জেলা বাপার সাধারণ সম্পাদক রশিদুস সুলতান বাবলু, বেলার রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল, সিনিয়র সাংবাদিক জুয়েল আহমেদ এবং রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সরকার মাজহারুল ইসলাম মান্নান বক্তব্য দেন।
এর আগে সকালে “যুবরাই লড়বে, সবুজ পৃথিবী গড়বে”-এই স্লোগানকে সামনে রেখে দুই দিনব্যাপী গ্রীন ভয়েস বিভাগীয় পরিবেশ সম্মেলনের উদ্বোধন হয়। সম্মেলনে রংপুর বিভাগের গ্রীন ভয়েসের ৪০টি ইউনিটের পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সংগঠন, সুধীজন ও গণমাধ্যমসহ প্রায় ৬০০ জন অংশগ্রহণ করছেন। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্বেচ্ছাসেবী, অরাজনৈতিক সংগঠনটি বর্তমানে দেশব্যাপী ১৫০টিরও বেশি ইউনিটের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রতিনিধি/এমআই