images

সারাদেশ

পর্যটক বরণে প্রস্তুত চা-বাগানের শহর

জেলা প্রতিনিধি

১৮ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিকে সামনে রেখে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত হয়ে উঠেছে পর্যটন নগরী মৌলভীবাজার। ঈদের দীর্ঘ ছুটি কাজে লাগিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য জেলার পাঁচতারকা হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসগুলোতে ঘোষণা করা হয়েছে নানা আকর্ষণীয় প্যাকেজ ও বিশেষ ছাড়।

পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।

শহরের কোলাহল ছেড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটাতে পর্যটকদের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে এখানকার চা-বাগান ঘেরা রিসোর্ট ও নিরিবিলি কটেজগুলো। ফলে ঈদের ছুটিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

48eb455b-d911-487a-93ec-04b338d85095

মৌলভীবাজার জেলা হাওড়, পাহাড় ও টিলাবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। এখানে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন শতাধিক পর্যটন স্পট। জেলার সবচেয়ে বেশি পর্যটক সমাগম ঘটে চায়ের দেশ নামে খ্যাত শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায়। সবুজে মোড়া উঁচুনিচু চা বাগান, মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের কারণে শ্রীমঙ্গল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রতি বছর ঈদ কিংবা দীর্ঘ সরকারি ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শ্রীমঙ্গলের চা বাগান, হাইল হাওর, বাইক্কার বিল, চা কন্যার ভাস্কর্য, বধ্যভূমি ৭১, বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র, রাবার বাগান, গোলটিলা, হাজমটিলা, সীতেশ বাবুর বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, গারোপল্লী, ভাড়াউড়া লেক, শংকর টিলাসহ শ্রীমঙ্গলের অসংখ্য পর্যটন স্পট ঘুরে দেখতে ঈদের ছুটিতে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এখানে ভিড় জমান। এছাড়াও কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ এবং মাধবপুর লেকও ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গল শহরের বাইরে রাধানগর গ্রাম এলাকায় থাকা প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ২২ থেকে ২৪ তারিখ—এই তিনদিনের জন্য প্রায় ৯০ শতাংশ বুকিং ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। মূলত এই তিনদিনকেই ঈদ ভ্রমণের ‘পিক টাইম’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ঈদকে ঘিরে বাকি দিনগুলোতেও ধীরে ধীরে বুকিং বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত শতভাগ রুম বুকড হয়ে যাবে।

অন্যদিকে, শহরের ভেতরের হোটেলগুলোতে এখনও তেমন চাপ তৈরি হয়নি। অধিকাংশ হোটেলেই এখনও প্রায় ৫০ শতাংশ বা তারও কম রুম বুকিং হয়েছে বলে জানা গেছে।

37547e6d-19d4-4cce-b0ac-2f32d55679de

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে পর্যটকদের বড় একটি অংশ শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চান। এ কারণে তারা শহরের হোটেলের পরিবর্তে শহরের বাইরে অবস্থিত রিসোর্ট ও কটেজে থাকতে বেশি আগ্রহী। এছাড়া এসব রিসোর্ট ও কটেজে কক্ষসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় আগাম বুকিং দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়। তবে ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই শহরের হোটেলগুলোতেও বুকিং বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, জেলার শ্রীমঙ্গলে গড়ে ওঠা অসংখ্য রিসোর্ট, কটেজ, হোটেল ও গেস্টহাউসে রাত্রিযাপন করেন সহস্রাধিক পর্যটক। পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের ১৫ থেকে ২০টি দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্রও প্রস্তুত করা হয়েছে পর্যটকদের বরণে। পাঁচতারকা মানের রিসোর্টসহ শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ, হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে এখানে। এদিকে ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন নামি-দামি চাইনিজ ও থাই খাবারের ক্যাফে-রেস্টুরেন্টগুলোও নতুন সাজে সজ্জিত করা হয়েছে।

পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে খাবারের মেন্যুতেও আনা হয়েছে নতুনত্ব। বাংলা, চাইনিজ ও থাই খাবারের পাশাপাশি আদিবাসী খাবারও রাখা হয়েছে মেন্যুতে। এছাড়া ঘুরতে আসা পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দিতে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট।

চামুং রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ইকো ক্যাফের স্বত্বাধিকারী তাপস দাশ বলেন, ঈদের ছুটিতে যারা শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে আসবেন, তাদের জন্য মূলত স্থানীয় ও আদিবাসী খাবারের বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে, যাতে তারা এ অঞ্চলের স্বাদ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।

c0f71d22-5270-40dd-8889-8ee7fe0e414a

বালিশিরা রিসোর্টের পরিচালক (পরিচালনা ও প্রশাসন) জাহানারা আক্তার বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আগত পর্যটকদের স্বাগত জানাতে আমরা রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট সুন্দরভাবে সাজিয়েছি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ঈদের দিন থেকে আমাদের প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং হয়ে থাকে। আশা করছি, গতবারের তুলনায় এবার আরও বেশি পর্যটক আসবেন এবং ব্যবসাও ভালো হবে। আগামী ২১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে।

গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, বরাবরের মতো এবারও ঈদকে ঘিরে রিসোর্টটিতে বেশ ভালো বুকিং হয়েছে। ঈদের সময়ে সাধারণত বিদেশি পর্যটক খুব একটা আসেন না; তবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন বেশি থাকে। সব মিলিয়ে বর্তমানে আমাদের বুকিং প্রায় শতভাগ পূর্ণ হয়ে গেছে।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ বলেন, ঈদুল ফিতরের ছুটিকে সামনে রেখে শ্রীমঙ্গলে মোটামুটি ভালো পর্যটক সমাগমের আশা করা যাচ্ছে। সাধারণত ঈদের দিন পর্যটকরা খুব বেশি আসেন না; তবে ঈদের একদিন পর থেকেই পর্যটকদের আগমন বাড়তে শুরু করে।

54a9214d-450e-4542-bb5f-26162033ffe4

ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। বিভিন্ন পর্যটন স্পটে আমাদের টহল ব্যবস্থা সার্বক্ষণিকভাবে চালু থাকবে। জেলা পুলিশের সমন্বয়ে উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। যাতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকেরা নির্বিঘ্নে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সে বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চ নজর রয়েছে।

জেলা প্রশাসন জানায়, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে সে লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশ দিায়িত্ব পালন করবে।

মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, ঈদের ছুটিতে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলা পুলিশ, থানা-পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে পুলিশ থাকবে, যাতে কোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। পর্যটকেরা যাতে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরতে পারে, এ জন্য সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিনিধি/টিবি