অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় উত্তরের বিভাগীয় রাজশাহী শহর ‘শিক্ষানগরী’ হিসেবে পরিচিত। হাজার হাজার দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে এখানকার সব পর্যটন কেন্দ্র। এছাড়া বিভিন্ন পেশার পর্যটকরাও ঘুরতে আসেন দেশ-বিদেশ থেকে ঘুরতে। তবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পর্যটন কেন্দ্রগুলো জনশূন্য অবস্থায় রয়েছে।
জানা গেছে, রাজশাহী নগরী ও জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে কয়েকটি উপজেলায় রয়েছে বিখ্যাত স্থাপত্য। এসব নজর কাড়ে পর্যটকদের। এরমধ্যে নগরীতে উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলো হলো— বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, চিড়িয়াখানা, শহীদ জিয়া শিশুপার্ক, পদ্মা গার্ডেন, লালন শাহ মুক্তমঞ্চ, আই বাঁধ, টি-গ্রোয়েন, শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী পার্ক ও হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহঃ)-এর মাজার।
বিজ্ঞাপন
আর জেলা এরিয়ায় পুঠিয়া উপজেলায় রাজবাড়ি, পুঠিয়া দোল ও শিব মন্দির, হাওয়াখানা, বাগমারা উপজেলায় হাজার দুয়ারী জমিদার বাড়ি (বীরকুৎসা), তাহেরপুর রাজবাড়ি, গোয়ালকান্দি জমিদার বাড়ি, তানোর উপজেলায় তুলসিক্ষেত্র, গোদাগাড়ী উপজেলায় সাফিনা পার্ক, মৃৎপল্লী, চারঘাট উপজেলায় নীলকুঠি এবং বাঘা উপজেলা বাঘা শাহী মসজিদ ও বাঘা দিঘী উল্লেখযোগ্য। এসব জায়গার সঙ্গে প্রাচীন আমলের বিখ্যাত ব্যক্তিদের নানা স্মৃতি জড়িত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাদুঘর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী কলেজের অদূরে অবস্থিত। ১৯১৩ সালে বাংলার তৎকালীন গভর্নর লর্ড কারমাইকেল প্রজ্ঞাপন জারি করেন, এরপর ১৯১৬ সালে এ জাদুঘর ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৬৪ সাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর পরিচালনা করে আসছে। জাদুঘরটিতে বহু মূল্যবান পাথর ও ও নির্মিত ভাস্কর্য, খোদিত লিপি, মুদ্রা, মৃৎপাত্র ও পোড়ামাটির ফলক, অস্ত্রশস্ত্র, আরবি ও ফারসি দলিলপত্র, চিত্র, বইপত্র রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় রেসের পর টমটম বা ঘোড়াগাড়ির দৌড় অনুষ্ঠিত হত।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে আসেন মুসলিম দরবেশ আব্দুল কুদ্দুছ জালালুদ্দীন, যিনি এ অঞ্চলে হযরত শাহ মখদুম রূপস (রহ:) নামে পরিচিত। ৬৮৫ হিজরিতে (১২৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি তার বড় ভাই সৈয়দ আহমদ ওরফে মীরন শাহকে নিয়ে বাগদাদ থেকে এ দেশে আসেন। রাজশাহীর তৎকালীন নাম বোয়ালিয়ায় এসে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। এরপর ১৩৩ খ্রিষ্টাব্দে এখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। রাজশাহী কলেজের কাছে পদ্মা নদীর অদূরে নগরীর দরগাপাড়ায় তার মাজার রয়েছে। প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী ও ভক্ত তার মাজার জিয়ারতে আসেন।
বিজ্ঞাপন

ইট ও পোড়ামাটির টেরাকোটায় বিভিন্ন লতাপাতা, ফুল-ফল ইত্যাদি বিভিন্ন নকশা অলংকৃত মসজিদ রয়েছে রাজশাহীর বাঘায়। দিঘির দক্ষিণ পাড়ে মুসলমানদের বিখ্যাত এ ইবাদত ঘরটি ‘বাঘা মসজিদ’ নামে পরিচিত। সুলতান নূসরত শাহ ১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেন। মোগল-পূর্ব যুগের একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন এটি। মসজিদের পাশের দিঘিতে শীত মৌসুমে প্রচুর অতিথি পাখির আগমন ঘটে, যা পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। তাছাড়া ঈদের পরদিন থেকে এখানে সপ্তাহব্যাপী মেলা বসে। বাঘা মসজিদ বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি সংরক্ষিত ইমারত। পুঠিয়া রাজবাড়ি সপ্তদশ শতকে মোগলদের শাসনামলে স্থাপিত বাংলার প্রাচীনতম স্থাপত্য।

এছাড়া, নগরীর পদ্মা গার্ডেন, লালন শাহ মুক্তমঞ্চ, টি-বাঁধ ও আই বাঁধ বিনোদন পিপাসুদের অন্যতম পছন্দের জায়গা। সকাল-সন্ধ্যা সারা বছর এসব বিনোদনকেন্দ্রে সমাগম ঘটে পর্যটকদের। পদ্মার বালুচর, নদীর পাড়ে আগাছা ও সবজির সবুজ প্রকৃতি এবং হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে মন প্রফুল্ল করেন হাজার হাজার বিনোদনপ্রেমী। জমজমাট বেচাবিক্রি হয় ফুটপাতের মুখরোচক খাবারের দোকানে।
তবে সরেজমিনে পবিত্র মাহে রমজানের শেষের দিকে এসব বিনোদন কেন্দ্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। রোজার জন্য দিনের বেলা প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ। ছুটির জন্য তরুণ-তরুণীদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। প্রায় জনশূন্য পদ্মার পাড়।

স্থানীয়রা জানান, ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মুখর থাকে এসব জায়গা। স্কুল কলেজ বন্ধ, তাই কেউ নেই। অবশ্য ঈদুল ফিতরের দিন ও এরপর এসব জায়গায় হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘুরতে আসেন পর্যটকরা। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বাড়তি প্রস্তুতি।
এ ব্যাপারে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র এডিসি গাজিউর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, রাজশাহী অনেক সুন্দর শহর। অনেক মানুষ ঘুরতে আসেন ঈদে। তবে এখন লোকজন কম। ঈদে পর্যটকরা আসবেন, ঘুরবেন রাজশাহী শহর। আমাদের পর্যাপ্ত ফোর্স রেডি রয়েছে। নগরবাসী, যাত্রী, পথচারী ও পর্যটকদের কোনো নিরাপত্তা ঘাটতি নেই। সকল পয়েন্টে পুলিশ ডিউটি করছে। পর্যটন কেন্দ্রেও পুলিশের পেট্রোল ডিউটি চলবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মুখপাত্র সাবিনা ইয়াসমিন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। জেলার এরিয়ার পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ টহল দেবে। থানাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সাদা পোশাকেও ডিউটি করবে পুলিশ। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। মানুষ আসবে নির্ভয়ে ঘুরবে, নিরাপত্তা প্রদানে পুলিশ প্রস্তত রয়েছে।
প্রতিনিধি/টিবি

