জেলা প্রতিনিধি
২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৩ এএম
রাজবাড়ী জেলা সদরের রামকান্তপুর ইউনিয়নের বারলাহুরিয়া গ্রামের ৫৮ বছর বয়সী কৃষক মো. আঞ্জু সেখ। চলতি মৌসুমে নিজের ৮ পাকি জমিতে করেছেন সরিষার আবাদ। বর্তমানে তার জমিতে সূর্যের আলোতে দক্ষিণা বাতাসে দোল খাচ্ছে সরিয়ার ফুল। দিগন্ত জোড়া মাঠে এ যেন হলুদ ফুলের স্বর্গরাজ্য।
কৃষক আঞ্জু সেখের মত এই গ্রামের জামসেদ মোল্লা, নজরুল সেখ, মো. আলমগীরসহ অনেক কৃষকই এ বছর করেছেন টরি ৭, স্থানীয়, বারি, বিনা, রায়সহ উচ্চফলনশীল জাতের সরিষার আবাদ। আবহাওয়া ভালো থাকায় জেলার ৫ উপজেলায় এ বছর ৫ হাজার ৮৩২ হেক্টর জমিতে সরিষার ফলনও হয়েছে বেশ ভালো।

মাঠের পর মাঠ সরিষা ফুলের হলুদ ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। এ যেন শীতকালে বাংলার প্রাণের প্রতিচ্ছবি। মাঠের এই সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মৌমাছির দল। ফুলে ফুলে উড়ে মধু সংগ্রহের এই দৃশ্য ভরিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতিপ্রেমীদের মন। এমন চোঁখ জুড়ানো দৃশ্য এখন রাজবাড়ীর সব উপজেলাতেই।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ীতে ৫৮৩২ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যো সদরে ১৮৩৫ হেক্টর, গোয়ালন্দে ২১৬৫ হেক্টর, পাংশায় ৪০০ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ৯৫৭ হেক্টর ও কালুখালী উপজেলায় ৪৭৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে।

হেক্টর প্রতি ১ হাজার ৩০০ কেজি সরিষা উৎপাদন হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। প্রতি মণ সরিষা ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সে হিসেবে রাজবাড়ীতে এ বছর ৫ হাজার ৮৩২ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত ৭ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন সরিষার বাজার দর প্রায় ৬২ কোটি ৯৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা।
দর্শনার্থী আল আমিন খোকন বলেন, ফসলের মাঠ যেন হলুদ বর্ণে ঘেরা স্বপ্নিল পৃথিবী। মাঠ জুড়ে উঁকি দিচ্ছে শীতের শিশির ভেজা সরিষা ফুল। হিমেল হাওয়ায় দোল খাওয়া গাছগুলো। সরিষার সবুজ গাছের হলুদ ফুল শীতের সোনাঝরা রোদে ঝিকিমিকি করছে।
কৃষক আঞ্জু সেখ বলেন, আমি ৮ পাকি জমিতে সরিষার আবাদ করেছি। সরিষা চাষের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর কম খরচ ও সহজ ব্যবস্থাপনা। আগাম আমন ধান কাটার পর টানি জমিতে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতেই বীজ বপন করা যায়। বীজ বপনের আগে সামান্য সার প্রয়োগ ছাড়া পরবর্তীতে তেমন সারের প্রয়োজন হয় না। সেচ ও নিড়ানির ঝামেলা কম থাকায় অন্যান্য ফসলের তুলনায় সরিষা চাষ অধিক লাভজনক।

কৃষক জামসেদ মোল্লা বলেন, আমি ২ পাকি জমিতে এ বছর সরিষা আবাদ করেছি। কার্তিক মাসে রোপণ করা সরিষা মাঘ মাসে সংগ্রহ করবেন কৃষকেরা। জমি প্রস্তুত, সেচ, সারের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে এ বছর বাজারে সরিষার ভালো দাম পেতে চাই আমরা কৃষকেরা।
সরিষা চাষি মো. নজরুল বলেন, ৪ পাকি জমিতে এবার সরিষা চাষ করেছি। বর্তমানে নতুন সরিষা প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা দাম পেলে কৃষকেরা লাভোবান হতে পারবে।
আরেক কৃষক মো. আলমগীর বলেন, ৪ পাকি জমিতে আমি উন্নতজাতের সরিষার আবাদ করেছি। বিঘা প্রতি সরিষা চাষে খরচ হয় প্রায় ৫ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে লাভ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। এছাড়া সরিষা চাষের ফলে বোরো আবাদে সারের খরচও কমে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দীপ্ত কুমার শর্মা জানান, ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমানো ও জমির উর্ব্বরতা বৃদ্ধির জন্য মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সরিষা চাষে উদ্ধুদ্ধ করছি। গতবার ভালো দাম পাওয়ায় এবার চাষিরা আরও আগ্রহী। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ভালো ফলন ও ভালো দাম পেয়ে কৃষকরা লাভবান হবেন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জনি খান জানান, তৈল জাতীর ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণোদনাসহ কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মাঝে সরিষা বীজ দেওয়া হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সরিষা গাছ ও ফুল ভালো হয়েছে। এই বছর কৃষকরা ভালো ফলন পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সরিষার জমিতে বেশি চাষ দিতে হয় না, তেমনই ওষুধও ছিটানো লাগে না। খরচ কম, লাভ বেশি তাই উপজেলার কৃষকরা সরিষা চাষে দিন দিন আগ্রহী হচ্ছেন। সরিষার আবাদ বৃদ্ধি ও ফলন ভালো পেতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রণোদনাসহ প্রযুক্তিগত নানা রকম পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিনিধি/টিবি