নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ১৫ নম্বর ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদি ফকিরহাট এলাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেল পরিবহনের পাইপলাইন ছিদ্র করে তেল চুরির ঘটনায় তোলপাড় চলছে।
সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, শুধু ফকিরহাট এলাকায় নয়, পতেঙ্গা, সীতাকুন্ড, মিরসরাই, ফেনী নোয়াখালীসহ পুরো পাইপলাইন ঘিরে এমন অসংখ্য গোপন আস্তানা রয়েছে। যেখান থেকে বিভিন্ন স্থাপনার আড়ালে পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনা ঘটছে।
মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদি ফকিরহাট এলাকায় পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনাকে পাইপলাইন লিকেজ হিসেবে উল্লেখ করায় এই আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। এ নিয়ে চলছে তুমুল সমালোচনা। বলা হচ্ছে, বিপিসির ভিতরেই ভুত রয়েছে। তেল চুরির ঘটনায় যোগসাজশ রয়েছে কর্মকর্তাদের।
এমন দাবি করেছেন বিপিসি নিয়ন্ত্রাধীন পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্টোলিয়াম কোম্পানী লিমিটেড, যমুনা অয়েল ও স্টান্ডার্ড এশিয়াটিকের তেল সরবরাহকারীরা। এ দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বিপিসির সংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্মচারীও। তারা জানান, গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকালে হাদি ফকিরহাট বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে পাইপলাইন থেকে তেল উপচে সড়কে পড়লে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে।
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় এক মাস আগে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আফসার পাইপলাইনের ওপর একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেন। পরে তিনি সেটি খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার আমিরুল ইসলামের কাছে ভাড়া দেন।
অভিযোগ রয়েছে, আমিরুল মাটি খুঁড়ে পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির চেষ্টা করছিলেন। তবে ছিদ্র দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তেল বের হতে শুরু করলে তিনি সরে পড়েন। এ সময় আশপাশের কিছু মানুষ বালতি ও পাত্র নিয়ে তেল সংগ্রহ করতে শুরু করেন।
খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে বিপিসির কর্মকর্তারা এসে তেল সরবরাহ বন্ধ করেন। এ ঘটনায় আফসারের স্ত্রী নুরজাহানকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে কয়েক ড্রাম তেল, একটি ড্রিল মেশিনসহ কিছু সরঞ্জাম পাওয়া গেছে।
মীরসরাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দিন কাদের জানান, মাটির প্রায় ১২ ফুট নিচে থাকা পাইপলাইনে ফুটো করে তেল চুরি করা হচ্ছিল। ঘটনাটি নজরে আসার পর স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। এ ঘটনায় পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং কী পরিমাণ তেল চুরি হয়েছে তা নিরূপণ চলছে।
মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, এ ঘটনায় বিপিসির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। টিনশেড ঘরের মালিক এ ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল। পরিকল্পিতভাবে ঘরটি তৈরি করা হয়েছিল। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যিনি ঘরটি ভাড়া নিয়েছিলেন, সেই মূলহোতাকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে। ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত।
আরও পড়ুন
টিনশেড ঘরটির মালিক নুরজাহান জানিয়েছেন, প্রায় এক মাস আগে আমিরুল ইসলাম ঘরটি ভাড়া নেন। তার স্বামী নুরুল আবছার ঘরটি ভাড়া দিলেও ভাড়াটিয়ার কোনো ঠিকানা সংরক্ষণ করেনি। তেল চুরির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর আমিরুল ইসলাম গা ঢাকা দিয়েছেন।
![]()
এমন সব তথ্য হাতে থাকার পরও এ ঘটনাকে পাইপলাইন লিকেজ বলে উল্লেখ করেছেন বিপিসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মনি লাল দাশ। ঘটনা তদন্তে তিনি গত ১০ জানুয়ারি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে তিনি নিজেই আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে পিটিসি পিএলসির উপ-মহাব্যবস্থাপককে (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) এবং সদস্য-সচিব করা হয়েছে বিপিসির উপ-ব্যবস্থাপককে-০২ (বাণিজ্য ও অপারেশন)। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
কমিটি গঠনের চিঠি অনুযায়ী, গত ৮ জানুয়ারি সিডিপিএল-এর ডিটি থেকে এসভি-১ অংশের ওই পাইপলাইনে লিক শনাক্ত হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার জন্য এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, শুধু হাদি ফকিরহাট এলাকায় নয়, পতেঙ্গার গুপ্ত খাল, কালির ছড়া, সীতাকুন্ড উপজেলার বারইয়ারহাট, বাঁশবাড়িয়া, মিরসরাই, ফেনী ও নোয়াখালীসহ পুরো পাইপলাইন ঘিরে এমন অসংখ্য গোপন আস্তানা রয়েছে। যেখান থেকে বিভিন্ন স্থাপনার আড়ালে পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনা ঘটছে। এসব তেল চুরির সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে বিপিসি ও নিয়ন্ত্রাধীন সংস্থার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (বাণিজ্য ও অপারেশন) ও যুগ্মসচিব ড. এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, হাদি ফকিরহাট এলাকায় তেল চুরির ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কারা দায়ী, কার দায়িত্বে অবহেলা ছিল, এটি যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি পরিকল্পিত ঘটনা সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। তেল চুরির ঘটনায় যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।
চুরির ঘটনাকে লিকেজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, চুরি হয়েছে-এটা আমরা জানি। কিন্তু লিকেজ কীভাবে হলো, কারা করলো, কারা দায়ী এসব বিষয় অনুসন্ধানের জন্যই এই কমিটি। ঘটনার সময় কেউ সরাসরি দেখেনি, তাই তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
প্রতিনিধি/টিবি