জেলা প্রতিনিধি
১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩১ পিএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি তৈল জাতীয় এই ফসলের, তাই ফলনও ভালো হয়েছে।
এবার জেলায় ১৭ হাজার ৫৬৯ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ১৬ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। মাঠে মাঠে এখন হলুদের সমারোহ। সরিষা জমির হলুদিয়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ। এ যেন প্রকৃতির রূপের খেলা। প্রতিদিন সকাল-বিকেল সৌন্দর্য পিয়াসুরা দল বেঁধে আসেন এই সরিষা ফুল দেখতে। অনেকেই জমিতে ঢুকে শখ করে ছবি তোলেন। কেউ সেলফি নিতে ব্যস্ত কেউবা পরিবারের ছবি তুলতে ব্যস্ত কেউ ঘুরে ঘুরে সরিষার জমি দেখছেন। এ যেন এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। এদিকে কৃষকেরা বলছেন, অল্প পুঁজিতে সরিষা চাষে অধিক লাভের স্বপ্ন দেখছেন তারা। কৃষি বিভাগ বলছে আগামীদিনে ভালো ফলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিসপুর ইউপির বাকাইল গ্রামের কৃষক মো. সাহাদ মিয়া জানান, চলতি বছরে সাড়ে পাঁচ কানি জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। সরিষা লাভজনক হওয়ায় গত তিন বছর ধরে সরিষা আবাদ করে আসছি। সরিষা চাষে খরচ কম, লাভ বেশি। এ বছর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এখন পর্যন্ত ভালো ফলন পাব বলে আশাবাদী। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবারের ফলন গত বছরের তুলনায় বেশি হবে বলে আশা করছি।

একই গ্রামের কৃষক এশাদৌলা জানান, এ বছর ছয় কানি জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরিষা গাছে ভালো ফুল এসেছে এবং ভালো ফলন পাবো বলে আশাবাদী। সরিষা একটি লাভজনক ফসল। এই ফসল আবাদে খরচ খুবই কম। ধান চাষ থেকেও সরিষাতে বেশি লাভ হয়। প্রতি কানিতে প্রায় ৫ থেকে সাড়ে পাঁচ মণ পর্যন্ত সরিষা পাওয়া যায়। যা বাজারে প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। সরিষা সময় মতো করতে পারলে একই জমিতে দুইবার ধান আবাদ করা যায়। কৃষি অফিস থেকে সার্বক্ষণিক আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করে আসছে।
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার শাহানা বেগম জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রবি মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলায় প্রায় ৭৬১ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬০ হেক্টর। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা থেকেও সরিষার আবাদ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কৃষি প্রণোদনার আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ জন কৃষককে সরিষার সার ও বীজ প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩০ জন কৃষককে বীজ ও সারসহ অন্যান্য উপকরণ দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, এ বছর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে বারি-১৪ জাতের সরিষা। স্বল্প সময়ে অধিক ফলন আসে বলে এই জাতটি কৃষকের নিকট জনপ্রিয়। তাছাড়া নতুন জাত হিসাবে বারি-২০ জাতের সরিষা প্রদর্শনী করেছেন ছোট বাকাইল গ্রামের কৃষক এশাদৌলা। তিনি এক সাথে পার্টনার প্রোগ্রামের আওতায় ছয় বিঘা জমিতে বারি-২০ জাতের সরিষা প্রদর্শনী করেছেন। পার্টনার প্রোগ্রামের আওতায় আরো ছয় বিঘা জমিতে ক্লাস্টার আকারে প্রদর্শনী স্থাপন করেছেন কাছাইট গ্রামের হারুন মিয়া। এসব প্রদর্শনীতে বারি-২০ সরিষার ভিত্তি বীজ প্রদান করা হয়েছে, যেন এ বছর কৃষকরা নতুন এই জাতের সরিষার বীজ নিজেরাই সংরক্ষণ করতে পারে। তাই প্রতিটি প্রদর্শনীতে কৃষকগণ বীজ সংরক্ষণ পাত্র হিসেবে উন্নত মানের লক যুক্ত ড্রাম পাবেন।
তিনি আরও জানান, সরিষার তেলের ভোজ্য মান ভালো, স্বাস্থ্যকর ও কোনো ভেজাল না থাকায় নিজেদের তেল নিজেরা উৎপাদন করে খাওয়ার অভ্যাস করতে পারলে অনেক ধরনের রোগ বালাই থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় সব থেকে ভালো মানের তেল উৎপাদনকারী বারি-১৮ জাতের সরিষা দশটি প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে।

বারি-১৮ একটি কেনুলা জাতের সরিষা, যার তেলে কোনো ইউরোসিক অ্যাসিড নেই এবং ভোজ্য তেল হিসেবে একটি উৎকৃষ্ট তেল।
তিনি আরও জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষকেরা রোপা আমন ও বোরো আবাদের মাঝামাঝি সময়ে একটি সরিষা আবাদ করতে পারলে এক বিঘা জমিতে ৬ মণ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত ফলন পেতে পারেন। আমরা সাধারণত শস্যা বিন্যাস ভিত্তিক প্রদর্শনী প্রদান করে শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি, কৃষকের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত আছি।

তিনি জানান, উন্নত দেশগুলোতে যেরকম টিউলিপ ফুল ও চেরি ফুল রয়েছে আমাদের রয়েছে সরিষার ফুল। সরিষা এমন একটি ফসল যার ফুল পাতা ও বীজ থেকে তেল ও বীজের ভর্তা খাওয়া যায়। তাই সরিষা আবাদ করে অধিক মুনাফা অর্জন করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার মুনসী তোফায়েল হোসেন বলেন, চলতি বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে সরিষা কম আবাদ করা হয়েছে। তবে চলতি বছরে সরিষার উৎপাদন ভালো হয়েছে, এর কারণ হলো এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারণে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ এবার নেই। সরিষায় বিভিন্ন পোকা মারক ও ছত্রাকের আক্রমণ এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।
তিনি আরও জানান, অত্যধিক ঠান্ডা ও কুয়াশায় সরিষা যেন নষ্ট না হয় সেদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। যতদিন কুয়াশা ও ঠান্ডা থাকবে এক সপ্তাহ পর পর সরিষা ক্ষেত্রে ছত্রাক নাশক স্প্রে করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সব উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা তা তদারকি করছেন। এখন পর্যন্ত জেলায় সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস