০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১৮ পিএম
-
দ্বৈত নাগরিকত্বের খড়গে বাতিল জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন
-
মনোনয়ন বাতিল আনিসুল ইসলাম ও শাকিলা ফারজানারও
-
মনোনয়ন স্থগিত বিএনপির প্রার্থী জসিমের
-
টিকে গেলেন গোলাম আকবর-গিয়াস কাদের উভয়ই
সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, দখলবাজি, বালুপাচার নিয়ে খুনোখুনিসহ নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত চট্টগ্রামের অনেক হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতা। যাদের অনেকে এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাচাই-বাছাইয়ে মনোনয়ন বাতিল নিয়েও তুমুল আলোচনার মুখে।
এর মধ্যে দ্বৈত নাগরিকত্বের খড়গে পড়ে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে। মনোনয়ন স্থগিত হয়েছে চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ আসনের বিএনপির প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদরও। যিনি ৫ আগস্টের আগের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন।
মনোনয়ন বাতিল হয়েছে চট্টগ্রাম-৫-হাটহাজারী আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী আনিসুল ইসলাম ও শাকিলা ফারজানারও। তবে চট্টগ্রাম-৬ রাউজান আসনে যাচাই-বাছাইয়ে মনোনয়ন টিকে গেল বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াস কাদের চৌধুরী। যা তুমুল আলোচনা চলছে চট্টগ্রামজুড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকায় মনোনয়ন বাতিল জামায়াত প্রার্থীর
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) সকালে মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার জিয়াউদ্দীন এ সিদ্ধান্ত জানান। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ডা. ফজলুল হক হলফনামায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা উল্লেখ করলেও এর পক্ষে কোনও কাগজপত্র জমা দেননি। তিনি হলফনামায় দাবি করেন, গত ২৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন।
বাছাইয়ের সময় তিনি জানান, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করা হয়েছে এবং সোমবার এ বিষয়ে শুনানি হবে। তবে এখনও দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এ বিষয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন।
এ আসনে বিএনপি থেকে আবু সুফিয়ানসহ আরও ১১ জন মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছিলেন। আবু সুফিয়ানের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
বিএনপি প্রার্থী জসিমের মনোনয়ন স্থগিত
ঋণ খেলাপি হওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদ জসিমের মনোনয়নপত্র প্রাথমিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা এ সিদ্ধান্ত নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রার্থীর ব্যাংক ঋণ সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে অ¯পষ্টতা ও জটিলতা দেখা দেওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়েছে।
রিটার্নিং অফিস সূত্র আরও জানায়, জসিম উদ্দিন আহমেদ জসিমের ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত বিষয়টি পুনরায় যাচাই করে রবিবার বিকেল চারটায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। ওই সময় যাচাই-বাছাইয়ের তালিকায় তার বিষয়ে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে।
মনোনয়ন বাতিল আনিসুল ইসলাম ও শাকিলা ফারজানার
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি নেত্রী শাকিলা ফারজানাসহ আরো তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল করা হয়েছে।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) দুপুরে নির্বাচন কমিশনের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে এ সিদ্ধান্ত জানান চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দলীয় মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন থেকে পাঠানো মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের মিল না পাওয়ায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিসুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। স্বাক্ষরের এই গরমিলই বাতিলের প্রধান কারণ।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী শাকিলা ফারজানা, এস এম ফজলুল হক এবং মো. ইমাম উদ্দিন রিয়াদের মনোনয়নপত্র নির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হয়েছে। অপরদিকে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর যাচাইয়ে পাঁচজন ভোটারের তথ্য ভুল পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্রও বাতিল ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে হাটহাজারী আসনে যাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে তারা হলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের মাওলানা রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা নাছির উদ্দীন মুনির, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মতিউল্লাহ নুরী এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. আলাউদ্দিন।
রাউজানে টিকে গেলেন বিএনপির গোলাম আকবর-গিয়াস কাদের উভয়ই
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে একইসঙ্গে বিএনপির মনোনীত দুই প্রার্থী গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মনোনয়ন পত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন নির্বাচন কর্মকর্তা। এর ফলে আপাতত উভয় প্রার্থী বিএনপির হয়ে নির্বাচনের মাঠে থাকলেন।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম-৬ আসনে মনোনয়ন পত্র যাচাইবাছাইয়ের পর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা উভয়ের মনোনয়ন পত্র বৈধ ঘোষণা করেন।
এদিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চট্টগ্রাম-৬ আসনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) ও চট্টগ্রাম- ১২ (পটিয়া) আসনের মনোনয়ন পত্র যাচাইবাছাই করা হয়। এছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়া উদ্দিনের কার্যালয়ে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড ও নগরীর একাংশ) এবং চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও নগরীর একাংশ) আসনের মনোনয়ন পত্র যাচাইবাছাই করা হয়।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে মনোনয়ন পত্র দাখিল করা পাঁচজনকেই বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এরা হলেন- বিএনপির গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মো. শাহজাহান মঞ্জু, গণসংহতি আন্দোলনের নাছিরউদ্দিন তালুকদার ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মদ ইলিয়াছ নূরী।
রাউজানে বিএনপি প্রথমে দলটির সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ঘোষণা করে। কিন্তু শেষ মুহুর্তে তাকে বাদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না দিয়ে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারকেও। এর ফলে উভয় প্রার্থীই মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করে দাখিল করেন।
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, প্রার্থীতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়ে একজনকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করে আরেকজনকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেবে দল।
গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হওয়া সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই। তাদের বাড়ি রাউজান উপজেলায়। ওই আসন থেকে গিয়াস কাদের আগেও দু‘বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি দেশে ফেরেন।
অন্যদিকে গোলাম আকবর খোন্দকার চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক। একই কমিটিতে তিনি দীর্ঘদিন সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজপথে সক্রিয় থাকায় তিনি বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাউজান উপজেলায় বিএনপিতে গিয়াস কাদের ও গোলাম আকবরের অনুসারী হিসেবে দুটি ধারা তৈরি হয়। গত এক বছরেরও বেশিসময় ধরে তাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘাতে এক ডজনেরও বেশি হত্যাকান্ড ঘটে। এমনকি গোলাম আকবর রাউজানে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে রক্তাক্ত হয়েছিলেন।
এদিকে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে মনোনয়ন পত্র দাখিল করা ৯ জনের মধ্যে তিনজনের বাতিল করা হয়েছে। বাছাইয়ে টিকেছেন বিএনপির হুমাম কাদের চৌধুরী, জামায়াতের এটিএম রেজাউল করিম, জাতীয় পার্টির মো. মেহেদী রাসেদ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মুহাম্মদ ইকবাল হাছান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল্লাহ আল হারুন এবং খেলাফত মজলিসের মো. আবুল কালাম।
বাতিল হওয়া তিনজন হলেন- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রমোদ বরণ বড়ুয়া, গণঅধিকার পরিষদের মো. বেলাল উদ্দীন এবং এবি পার্টির মো. আব্দুর রহমান। এদের মধ্যে সিপিবি ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর দলীয় মনোনয়ন সঠিক না হওয়ায় এবং এবি পার্টির প্রার্থীর সমর্থকের সই ও আয়কর সংক্রান্ত তথ্য না থাকাসহ বিভিন্ন ত্রুটির কারণে বাতিল করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের তথ্যে জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়া ১১ জনের মধ্যে এলডিপিসহ ৪ প্রার্থীকে বাতিল করা হয়েছে। বৈধ ঘোষিত ৭ জন হলেন- বিএনপির মোহাম্মদ এনামুল হক, জামায়াতের মোহাম্মদ ফরিদুল আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এস এম বেলাল নূর, জাতীয় পার্টির ফরিদ আহম্মদ চৌধুরী, ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ আবু তালেব হেলালী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ছৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু ও গণঅধিকার পরিষদের এমদাদুল হাসান।
বাকি ৪ জনের মধ্যে ঋণখেলাপী হওয়ায় এলডিপির ইয়াকুব আলী, দলীয় মনোনয়ন সঠিক না হওয়ায় জাতীয় পার্টির সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং দ্বৈবচয়ন প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের পর এক শতাংশ ভোটারের সই সঠিক না পাওয়া দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ সাদাত আহমেদ ও মুহাম্মদ শাখাওয়াত হোসাইনের মনোনয়ন পত্র বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুন্ড ও নগরীর আংশিক) আসনে বিএনপির আসলাম চৌধুরী, জামায়াতের আনোয়ার ছিদ্দিক, সিপিবির মো. মছিউদ্দৌলাসহ ১০ জন মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছিলেন, যাদের সবাই বাছাইয়ে টিকেছেন।
উল্লেখ্য, নির্বাচন তফসিল অনুযায়ী বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আগামী ১১ জানুয়ারির মধ্যে আপিল করতে পারবেন।
প্রতিনিধি/ক.ম/