জেলা প্রতিনিধি
১০ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৫ পিএম
যশোরে গেল ৩ মাসে অন্তত ২০০ জনকে সাপে দংশন করেছে। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জন বিষধর সাপের কামড়ের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।
তবে রাসেলস ভাইপার নিয়ে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও যশোরে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্যবিভাগ।
এদিকে গত সোমবার (৮ জুলাই) সাপে দংশন সন্দেহে চৌগাছার ১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তাদের শরীরে সাপে কামড়ানোর কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তারা মাস সাইকোজেনেটিক ইলনেসের শিকার।
গত জুন মাসে ৩১ জন সাপের দংশনের শিকার হয়ে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে একজন রেফার্ডকৃত রোগীর মৃত্যু হয়। অন্যরা সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। জুলাই মাসের প্রথম ৭ দিনে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ৭ জন সাপে কাটা রোগী ভর্তি হয়। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী এগুলো সবই অবিষধর সাপ। তবে সোমবার (৮ জুলাই) চৌগাছায় ১২জনকে সাপে কেটেছে বলে খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী। এদের মধ্যে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ১১ জন ভর্তি হয়েছে মর্মে খবর পাওয়া গেছে। তবে তাদের কারও শরীরে সাপে কামড়ানোর দাগ ও বিষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুণ অর রশিদ। সাপে দংশনের পর মৃত্যুবরণকারীদের একজন চৌগাছার রাবিয়া বেগম (৪০)। ঘুমন্ত অবস্থায় সাপের দংশনে ৪ সন্তানের জননী রাবিয়া বেগমের (৪০) মৃত্যু হয়। রাত ১০টায় নিজ ঘরে তাকে সাপে কাটে। পরদিন মঙ্গলবার (৯ জুলাই) সকালে তাকে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
![]()
মৃত রাবিয়া পাশাপোল ইউনিয়নের রানিয়ালি গ্রামের আব্দুল হকের স্ত্রী। এছাড়াও শার্শার নিজামপুরে বিষধর সাপের কামড়ে প্রান্তি নামে ৬ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়।
২৯ জুন রাতে উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের একঝালা গ্রামের নিজ বাড়িতে তাকে সাপে কামড় দেয়। প্রান্তি একঝালা গ্রামের সোহাগ হোসেনের মেয়ে। সে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। রাত ১২টার দিকে তার হাতে একটি সাপ কামড় দেয়। তাকে প্রথমে শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে নেওয়া হয় যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে। এরপর খুলনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় প্রাপ্তির।
অভয়নগরে বিষধর সাপের কামড়ে বিপ্লব দাস নামে এক যুবক মারা যান ২৭ জুন। উপজেলার ভাটপাড়া বাজারের একটি দোকানে কাজ করার সময় তাকে সাপে কামড় দেয়। সেখান থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
ব্যবসায়ী অভি দাস জানান, বিপ্লব তার দোকানে কাজ করতেন। রাত ১০টার দিকে ক্রেতার জন্য তাকের ওপর রাখা বস্তা থেকে চাল আনার সময় বস্তায় হাত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি সাপ তার বাম হাতের আঙ্গুলে কামড় দেয়। তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথে তিনি মারা যান।
যশোরের শার্শা উপজেলায় ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সাপের কামড়ে আবদুল্লাহ (১৪) নামে এক চাঁদপুর হাফেজিয়া মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যু হয়। ২১ জুন উপজেলার বেলতা গ্রামে সাপটি কামড় দেয়। পরে রাত ৯টার দিকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু ঘোষণা করেন চিকিৎসক। সে উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের টেংরালী গ্রামের আলমগীর হোসেনের ছেলে। দুপুরে ফুফুর বাড়ির আঙিনায় স্তুপ করা ইটের পাশে কয়েকজন শিশুর সঙ্গে খেলছিল আবদুল্লাহ। এ সময় একটি ছোট সাপ তার ডান হাতের আঙ্গুলে কামড় দেয়। বেলা ৩টার দিকে নিজের বাড়িতে ফিরে মা-বাবাকে বিষয়টি জানায় আবদুল্লাহ। অবস্থার অবনতি হলে রাত ৯টার দিকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মো. শাকিরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, প্রথম ধাপে হাসপাতালে না এনে বাড়িতে রাখায় শরীরে বিষ ছড়িয়ে পড়ায় তার মৃত্যু হয়েছে।
গত ১১ জুন যশোরের অভয়নগর উপজেলায় সাপের কামড়ে আসমা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। ওইদিন রাতে মালাধরা গ্রামের গৃহবধূর আসমাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। তিনি একই গ্রামের সাইদুল ইসলামের স্ত্রী। সাইদুল ইসলামের ভাইপো হাবিবুর রহমান জানিয়েছিলেন, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তার কাকির (আসমা বেগম) ডান পা ঘরে রাখা মিটসেফের নিচে চলে যায়। এ সময় মিটসেফের নিচে থাকা সাপ ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে কামড় দেয়। তাকে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাত সাড়ে আটটার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গত ২১ মে যশোরের চৌগাছায় সাপের কামড়ে রনি হোসেন (১৫) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়। রাত ১টার দিকে উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের চাঁদপাড়া গ্রামের বাজার পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। রনি হোসেন গ্রামের কৃষক জাবেদ আলীর ছেলে। নিহতের বাবা জানান, রনি রাত ১২টার দিকে হঠাৎই ঘুম থেকে উঠে যন্ত্রণায় ডাকাডাকি শুরু করে। এক পর্যায়ে রনির বিছানায় একটি বিষধর গোখরা সাপ দেখতে পাই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাত আনুমানিক ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। যশোরের মনিরামপুরে ১৫ এপ্রিল সাপের কামড়ে সাকিব হোসেন (২১) এক যুবকের মৃত্যু হয়। সাপে কামড়ানোর পর রাত ১০টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। সাকিব হোসেন উপজেলার এড়েন্দা গ্রামের মোশারফ হোসেনের ছেলে। রোহিতা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আমিন উদ্দিন জানান, সন্ধ্যায় বাড়ির পাশে রাস্তার ধারে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার সময় পাশেই একটি ইঁদুরের গর্ত বাম হাত ঢুকিয়ে দিলে সাপে কামড় দেয়। তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। পথে রাত ১০টার দিকে সাকিবের মৃত্যু হয়।
যশোর জেনারেল হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুণ অর রশিদ জানান, এ পর্যন্ত রাসেল ভাইপারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়েছেন, তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বেশিরভাগই অবিষধর সাপ। শুধু শার্শার একটি শিশুকে রেফার্ড করা হয়েছিল, সে মারা গেছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম রয়েছে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, গত ৩ মাসে অন্তত ২০০টির মতো সাপে কাটার খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে কম সংখ্যকই বিষধর। তবে রাসেল ভাইপারের কোনো খবর পওয়া যায়নি। ভয়েরও কারণ নেই। এ মৌসুমে প্রতিবছরই সাপের কামড়ে কেউ না কেউ মারা যান। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে, আতঙ্কিত না হয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।
প্রতিনিধি/এসএস