Dhaka Mail Logo

শিল্প ও সাহিত্য

কবি নজরুলের যে চিঠির বয়স এক শতাব্দী

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

দশম পর্ব

প্রিয় পাঠক 
কবি নজরুলের স্নেহধন্য শামসুন্নাহার মাহমুদকে লেখা এই পত্রটির আজ শেষ পর্ব। কিন্তু নজরুল পত্রাবলী আলোচনার শেষ পর্ব নয়। আরো পর্ব চলমান রাখার ইচ্ছে আছে।

সাহিত্যমানের দিক থেকে এই পত্রাংশেরও সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর কবিত্বময় গদ্য। ভাষা সহজ ও কথোপকথনের মতো। কিন্তু তার মধ্যেই গভীর ভাব, আবেগ ও কল্পনা সতত প্রবহমান। ব্যক্তিগত বক্তব্যকে কবি নজরুল এমনভাবে প্রকাশ করেছেন যে, তা সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।

আমার জীবনের যে বেদনা, যে রঙ তা আমার লেখায় পাবে। অবশ্য লেখার আমার জীবনের ছোট-খাট কথা জানতে চেয়েছ। বড় মুশকিল কথা ভাই। ঘটনাগুলো আমার জীবনের নয়, লেখার রহস্যটুকু আমার, ওর বেদনাটুকু আমার। ঐখানেই তো আমার সত্যিকার জীবনী লেখা রয়ে গেল। জীবনের ঘটনা দিয়ে কৌতুক অনুভব করতে পারো। কিন্তু তা দিয়ে আমাকে চিনতে পারবে না। সূর্যের কিরণ আসলে সাতটা রঙ-রামধনুতে যে রঙ প্রতিফলিত হয়। কিন্তু সূর্য যখন ঘোরে, তখন তাকে দেখি আমরা শুভ্র জ্যোতির্ময় রূপে। সূর্যের চলাটা প্রতারণা করে আমাদের চোখকে তার বুকের রঙ দেখতে দেয় না সে। কিন্তু ইন্দ্রধনু যখন দেখি, ওরেই দেখতে পাই ওর গোপন প্রাণের রঙ। ইন্দ্রধনু যেন সূর্যের লেখা কাব্য। মানুষের জীবনই মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রতারণা করে। রাধা ভালোবেসেছিল কৃষ্ণকে নয়, কৃষ্ণের বাঁশিকে। তোমরাও ঠিক ভালোবাসো আমাকে নয়-আমার সুরকে, আমার কাব্যকে। সে তো তোমাদের সামনেই রয়েছে। আবার আমায় নয়ে কেন টানাটানি, ভাই? সূর্যের কিরণ আলো দেয়, কিন্তু সূর্য নিজে হচ্ছে দগ্ধ দিবানিশি। ওর কাছে যেতে যে চায় সেও হয় দগ্ধীভূত। আলো সওয়া যায়, শিখা সওয়া যায় না। আমি জ্বলছি শিখার মতো, আপনার আনন্দে আপনি জ্বলছি, কাছে এলে তা দেয় দাহ, দূর হতে দেয় আলো। তোমাদের কাছে ছিলাম যে-আমি, সেই-আমি আর চিঠির-আমি কি এক? তোমরা কবিকে জানতে চাও, না নজরুল ইসলামকে জানতে চাও, তা আগে জানিও; তাহলে আমি এর পরের চিঠিতে একটু একটু করে জানাব তার কথা। চাঁদ জোছনা দেয়, কথা কয় না-বহু চকোর-চকোরীর সাধ্য-সাধনাতেও না। ফুল মধু দেয়, গন্ধ দেয়, কথা কয় না-বহু ভ্রমরার সাধ্যসাধনাতেও না। বাঁশি কাঁদে, যখন গুণীর মুখে তার মুখে চুমোচুমি হয়; বাকি সময়টুকু সে এক কোণে নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে পড়ে থাকে। একই ঝাড়ের বাঁশ ভাগ্যদোষে বা গুণে কেউ হয়ে ওঠে লাঠি, কেউ হয় বাঁশি। বীণা কত কাঁদে, কথা কয় গুণীর কোলে শুয়ে, বাকি সময়টুকু তার খোলের মধ্যে আপনাকে হারিয়ে সে নিষ্পন্দিত হয়ে থাকে। গানের পাখি, তাকে গানের কথাই জিজ্ঞাসা করো, নীড়ের কথা জিজ্ঞাসা কোরো না। নিজেই বলতে পারবে না যে, কোথায় ছিল তার নীড়। জন্ম নিয়ে গান শিখে উড়ে যাবার পর নীড়টার মতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস আর তার কাছে নেই। নীড়ের পাখি তখন বনের পাখি হয়ে ওঠে। গুরুদেব বলেছেন, ফসল কেটে নেবার পর মাঠটার মতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস আর নেই। তবু সেই অপ্রয়োজনের যদি প্রয়োজন অনুভব করে তোমাদের কৌতুক, তবে জানিয়ো।

চিঠি লিখছি আর গাচ্ছি একটা নতুন লেখা গানের দুটো চরণ:

‘হে ক্ষণিকের অতিথি, এলে প্রভাতে কারে চাহিয়া
ঝরা শেফালির পথ বাহিয়া।
কোন অমরার বিরহিনীরে চাহনি ফিরে,
কার বিষাদের শিশির-নীরে এলে নাহিয়া।’
কবির আসা ঐ শেফালির পথ বেয়ে আসা। কার বিষাদের শিশির-জলে নেয়ে আসে তা সে জানে না। তার নিজের কাছেই সে একটা বিপুল রহস্য।

আমার লেখা কবিতাগুলো চেয়েছ। হাসি পাচ্ছে খুব কিন্তু। কী ছেলেমানুষ তোমরা দুটি ভাই বোন। যে-খন্তা দিয়ে মাটি খোঁড়ে মালী, সেটারও যে দরকার পড়ে ফুলবিলাসীর, এ আমার জানা ছিল না। যে পাতার কোলে ফুল ফোটে, সে-পাতা কেউ চায় না, এই আমি জানতাম। মালা গাঁথা হবার পর ফুল-রাখা পদ্ম-পাতাটার কোনো দরকার থাকে, এও একটা খুব মজার কথা, না? যাক, চেয়েছ-দেবো। তবে এ পল্লব শুকিয়ে উঠবে দুদিন পরে, থাকবে যা তা ফুলের গন্ধ। তাছাড়া অত কবিতাই বা লিখব কোথেকে যে খাতা ভর্তি করে দেবো। বসন্ত তো সব সময় আসে না। শাখার রিক্ততাকে যে ধিক্কার দেয়, সে অসহিষ্ণু; ফুল ফোটার জন্যে অপেক্ষা করতে জানে যে, সে-ই ফুল পায়। যে অসহিষ্ণু চলে যায়, সে তো পায় না ফুল, তার ডালা চিরশূন্য রয়ে যায়। তোমাদের ছায়া-ঢাকা, পাখি-ডাকা দেশ, তোমাদের সিন্ধু পর্বত গিরিদরী-বন আমায় গান গাইয়েছিল। তোমাদের শোনার আকাঙ্ক্ষা আমায় গান গাইয়েছিল। রূপের দেশ ছাড়িয়ে এসেছি এখন রূপেয়ার দেশে, এখানে কি গান জাগে? বীণাপাণির রূপের কমল এখানকার বাস্তবতার কঠোর ছোঁয়ায় রূপার কমল হয়ে উঠেছে। কমলবনের বীণাপাণি ঢুকেছেন এখানের মাড়োয়ারি মহলে। ছাড়া যেদিন পাবেন, আসবেন তিনি আমার হৃৎকমলে। সেদিনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই আমার।

আমার কবিতার উৎস-মুখের সন্ধান চেয়েছ। তার সন্ধান যতটুকু জানি নিজে দেখিয়ে দেবো।
আর কিছু লিখবার অবসর নেই আজ। মানস-কমলের গন্ধ পাচ্ছি যেন, কেমন যেন নেশা ধরছে; বোধ হয় বীণাপাণি তার চরণ রেখেছেন এসে আমার অন্তর-শতদলে। এখন চললাম ভাই। চিঠি দিও শীগগীর। আমার আশিস নাও। 
ইতি-

তোমার
‘নূরুদা’

পুন:
তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়ে এসেছি, সেসব ভুলে যেও। তোমার আম্মা ও নানী সাহেবার পাক কদমানে হাজার হাজার আদাব জানাবে আমার। শামসুদ্দিন ও অন্যান্য ছেলেদের স্নেহাশিস জানাবে। তুমি কী বই পড়লে এর মধ্যে বা পড়ছ, কী কী লিখলে, সব জানাবে। তোমার লেখাগুলো আমায় আজই পাঠিয়ে দেবে-চিঠি দিতে দেরি করো না। ‘কালিকলম’ পেয়েছ বোধ হয়। তোমায় পাঠানো হয়েছে। তোমার লেখা চায় তারা।

-‘নূরুদা’

কাজী নজরুল ইসলামের এই চিঠির মূল বক্তব্য হলো কবি এবং তার ব্যক্তিজীবনের স্পষ্ট পার্থক্য। সাধারণ মানুষ কবির জীবনের ছোটখাটো ঘটনা জানতে চায়। কিন্তু কবির প্রকৃত পরিচয় থাকে তার কাব্যের বেদনার ভেতরে। সূর্যের আলো আমরা দেখতে পাই, কিন্তু সূর্যের ভেতরের দহন আমরা দেখি না। কবিও নিজের কষ্টের আগুনে জ্বলে অন্যকে আলো ও আনন্দ দেন। পাঠক আসলে কবিকে নয়, বরং কবির সুর ও কাব্যকে ভালোবাসে। তাই কবির ব্যক্তিজীবন আর তার সৃষ্টির রূপ কখনোই এক নয়। কবি মনে করেন, মানুষের বাহ্যিক জীবন রূপক ও প্রতারণায় ভরা। শিল্পী ও তার সৃষ্টির সম্পর্ক অত্যন্ত নিঃস্বার্থ। গান শেখার পর পাখি যেমন নীড়ের কথা ভুলে বনের পাখি হয়ে ওঠে, কবিও তেমনি সৃষ্টির পর নিজের অতীত নিয়ে পড়ে থাকেন না। বাঁশি বা বীণা যতক্ষণ সুর তোলে, ততক্ষণই তার সার্থকতা। সুর থেমে গেলে সে এক কোণে নিঃশব্দ হয়ে পড়ে থাকে। এখানে কবি আত্মত্যাগের এক মহান বার্তা দিয়েছেন। আলো উপভোগ করা সহজ, কিন্তু শিখার দাহ সহ্য করা কঠিন। কবির কাছে যাওয়া মানে সেই দাহ অনুধাবন করা। আবার পার্থিব বস্তুবাদী জগতের প্রতি কবির তীব্র বিরাগ দেখা যায়। ‘রূপের দেশ’ ছেড়ে ‘রূপেইয়ার দেশ’-এ এসে শিল্পীর আসল প্রেরণা হারিয়ে যায়। একই সঙ্গে কবি ধৈর্যের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। বসন্ত না এলে জোর করে ফুল ফোটানো যায় না। অনুপ্রেরণা ছাড়া জোর করে কাব্য সৃষ্টি অসম্ভব।

পত্রের এই অংশেরও নান্দনিক আবেদন অত্যন্ত গভীর ও মনোহর। এটি গদ্যে লেখা হলেও এর প্রতিটি ছত্রে কবিতার সুর রয়েছে। চিঠির মাঝে যুক্ত করা গানের দুটি চরণ পুরো লেখার বিষাদময় ভাবকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ঝরা শেফালি, প্রভাতের শিশির, পদ্মপাতা এবং মানস-কমলের রূপকল্প পাঠককে সুনিবিড়-শান্তিময় ও রূপময় জগতে নিয়ে যায়। সুবাস, আলো, সুর ও দাহের মতো স্পর্শগ্রাহ্য অনুভূতিগুলো এখানে খুব সুন্দরভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। লেখাটি পাঠকের মনে একই সঙ্গে সুমধুর সৌন্দর্য ও বিষাদের জন্ম দেয়। পক্ষান্তরে, প্রতীক ও রূপক ও বিভিন্ন উপমা ব্যবহার করে কবি তার লেখনিকে কালোত্তীর্ণ পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। সূর্য হলো কবির জীবনের প্রতীক এবং রামধনু হলো তার কাব্যের প্রতীক। সূর্য নিজে পুড়ে বিশ্বকে আলো দেয়, কবিও তেমনি কষ্ট সহ্য করে কাব্য রচনা করেন। ‘বীণাপাণি’ এবং ‘মানস-কমল’ হলো পবিত্র শিল্পপ্রেরণার প্রতীক। একই বাঁশ থেকে লাঠি এবং বাঁশি তৈরির উদাহরণটি অত্যন্ত অর্থবহ। এর মাধ্যমে কবি ভাগ্যের ভিন্নতাকে তুলে ধরেছেন। আবার ‘রূপের দেশ’ এবং ‘রূপেইয়ার দেশ’ এই দুটি শব্দের ব্যবহারে কবি সৌন্দর্য এবং বস্তুবাদের অমিল স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন। এছাড়া পদ্মপাতা ও ফুলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন যে, মানুষ কেবল সুন্দর সৃষ্টিকেই গ্রহণ করে, সৃষ্টির পেছনের অনুষঙ্গকে ভুলে যায়।

কাজী কাজী নজরুল ইসলাম-এর এই দীর্ঘ পত্রটি সাহিত্যদর্শন, জীবনদর্শন, শিল্পবোধ, নারীশিক্ষা-সম্পর্কিত চিন্তা, মানবিকতা এবং সৌন্দর্যতত্ত্বের অসাধারণত্বে অদ্বিতীয়। এই পত্রের মধ্যে কাজী নজরুলকে একাধারে কবি, দার্শনিক, প্রেমিক, সমাজ সংস্কারক এবং শিল্পীর সত্বায় দেখা যায়। চিঠির প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো- আত্মা ও রক্তের সম্পর্ক নিয়ে নতুন তত্ব প্রদান। যেমন: নজরুল বলেন, 
‘অদ্ভুত রহস্যভরা এই মানুষের মন। রক্তের সম্বন্ধকে অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই যার, সে-ই কখন পথের সম্বন্ধকে সকল হৃদয় দিয়ে অসঙ্কোচে স্বীকার করে নেয়। ঘরের সম্বন্ধটা রক্তমাংসের, দেহের কিন্তু পথের সম্বন্ধটা হৃদয়ের অন্তরতম-জনার। তাই ঘরের যারা, তাদের আমরা শ্রদ্ধা করি, মেনে চলি, কিন্তু বাইরের আমার-জনকে ভালোবাসি, তাকে না-মানার দুঃখ দিই। ঘরের টান কর্তব্যের, বাইরের টান প্রীতির-মাধুর্যের। সকল মানুষের মনে সকল কালের এই বাঁধনহারা মানুষটি ঘরের আঙিনা পেরিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছে। যে নীড়ে জন্মেছে এই পলাতক, সেই নীড়কেই সে অস্বীকার করেছে সর্বপ্রথম উড়তে শিখেই!’ 

এখানে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের প্রকৃত বন্ধন সবসময় রক্তের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। কখনও কখনও হৃদয়ের আকর্ষণ, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিক অনুভূতি মানুষকে আরো গভীরভাবে যুক্ত করে। এই মুক্তিই মানুষকে প্রকৃত প্রেমের সন্ধান দেয়। কবি নজরুল কল্পনাবিলাসী ছিলেন। তবে তিনি অবাস্তব কল্পনা কমই করতেন। প্রকৃতির ফুল-ফল, পাখি প্রভৃরি সাথে মানব জীবনের অচ্ছেদ্য বন্ধন তিনিই আবিষ্কার করেন। অর্থাৎ, আইনস্টাইন যেমন মনে করতেন, পৃধথবীর সবকিছু একে অপরের সাথে সম্পর্কিত (connected) তেমনি নজরুলও জীবজগতের সবার সাথে সবার সংযোগ কল্পনা করতেন। এই জন্য তার স্বভাবই ছিলো-নিজেকে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের সাথে তুলনা করা। এই পত্রেও যেমন তিনি কোকিল, পাপিয়া, বনের নাম না জানা পাখির সাথে, ভাসমান গানের সাথে তুলনা করেছেন। 

‘বিশেষ করে গানের পাখি যারা, তারা চিরকেলে নিরুদ্দেশ দেশের পথিক। কোকিল বাসা বাঁধে না, ‘বৌ কথা কও’-এর বাসার উদ্দেশ্য আজো মিলল না, ‘উহু উহু চোখ গেল’ পাখির নীড়ের সন্ধান কেউ পেল না! ওদের আসা-যাওয়া একটা রহস্যের মতো। ওরা যেন স্বর্গের পাখি, ওদের যেন পা নেই, ধূলার পৃথিবীতে যেন বসবে না, ওরা যেন ভেসে-আসা গান। তাই ওরা অজানা ব্যথার আনন্দে পাগল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে দেশে বিদেশে, বসন্ত-আসা বনে, ফুল-ফোটা কাননে, গন্ধ-উদাস চমনে। ওরা যেন স্বর্গের প্রতিধ্বনির টুকরার-আনন্দের উল্কাপিণ্ড! সমাজ এদের নিন্দা করেছে, নীতিবাগীশ বায়স তার কুৎসিত দেহ-ততোধিক কুৎসিত কণ্ঠ নিয়ে এর ঘোর প্রতিবাদ করেছে, এদের শিশুদের ঠুকরে ‘নিকালো হিঁয়াসে’ বলে তাড়িয়েছে, তবু আনন্দ দিয়েছে এই ঘর-না-মানা পতিতের দলই। নীড়-বাঁধা সামাজিক পাখিগুলি দিতে পারল না আনন্দ, আনতে পারল না স্বর্গের আভাস, সুরলোকের গান...।’

শিল্পীর প্রকৃতি পাখির মতোই মুক্ত। পাখির ন্যায় শিল্পী কোন বাঁধনে থাকতে পারে না। তাই তিনি লিখেছেন, ‘গানের পাখি যারা, তারা চিরকেলে নিরুদ্দেশ দেশের পথিক।’ এর মাধ্যমে কবির আত্মপরিচয় স্পষ্ট। পাখির মতোই কবিরও নেই কোন চাওয়া-পাওয়া। পাখির যেমন হাসিতেও গান; কান্নাতেও গান। কবিরও তাই। তিনি পৃথিবীর কাছে কিছুই প্রত্যাশা করেন না। কবি ধনসম্পদ চান না। তিনি চান-ভালোবাসা, আন্তরিকতা, সৌন্দর্য, সরলতা, বিশ্বাস, স্বচ্ছতা, সম্মান ও শ্রদ্ধা। তিনি তাই সপ্রাঞ্জলে বলেন, 
‘কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি।’ এটিকে নজরুল-শিল্পদর্শনের অন্যতম দার্শনিক-মানবিক উক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাই এই চিঠির গভীরে এক ধরনের আধ্যাত্মিক মানবতাবাদও কাজ করছে। জীবন মানে অনন্ত যাত্রা। নজরুলের কাছেও জীবন কোন স্থির অবস্থা নয়। তিনি নিজেকে দেখেন, পথিক, যাযাবর, উড়ন্ত পাখি, ক্ষণিকের অতিথি বা সমুদ্রগামী নদী হিসেবে। তার ভাষায়, ‘নদীর জল চলছে সমুদ্রের সাথে মিলতে।’ 

এখানে নদী হলো মানুষ এবং সমুদ্র হলো চিরসুন্দর, পরম সত্য। কাজী নজরুল ছিলেন, পিবি শেলীর মতো সুন্দরের পুজারী। ‘Ode on a Grecian Urn’ কবিতায় জন কিটস বলেন, Beauty is truth, truth beauty, that is all Ye know on earth, and all ye need to know. কাজী নজরুল ইসলামও সুন্দর-ই সত্য, সত্যই সুন্দর এমন প্রচেতনার কবি ছিলেন। সুন্দরের উপসনাই মূলত সত্যের উপাসনা। সুন্দর কবিতাই সত্য। আর সত্য কবিতাই সুন্দর। তাই বাংলার জন কীটস কাজী নজরুল বলেন, 
‘কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি, কবি চায় প্রীতি, কবি চায় পূজা। কবিত্ব আর দেবত্ব এইখানে এক। কবিতা আর দেবতা-সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয় সুন্দর যা তাই নিয়ে। রূপার দাম আছে বলেই রূপা অত হীন। হাটে-বাজারে মুদির কাছে, বেনের কাছে ওজন হতে হতে এর প্রাণান্ত ঘটল; রূপের দাম নেই বলেই রূপ এত দুর্মূল্য, রূপ এত সুন্দর, এত পূজার। রূপা কিনতে হয় রূপেয়া দিয়ে, রূপ কিনতে হয় হৃদয় দিয়ে। রূপের হাটের বেচা-কেনা অদ্ভুত। যে যত বিনা দামে কিনে নিতে পারে, সে তত বড় রূপ-রসিক সেখানে।’

লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক।