Dhaka Mail Logo

শিল্প ও সাহিত্য

নজরুল পত্রে প্রেম

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

পঞ্চম পর্ব

ক্ষমা ও মহত্ত্বে নজরুল চিরোত্তম। এই চিঠির (গত পর্বে উল্লেখিত চিঠি) একটি অসাধারণ গুণ হলো মহত্ত্ব; যার মাধ্যমে নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছানো যায়। প্রেমিক বারবার বলছেন, ‘আমার কোনো অশ্রদ্ধা নেই।’ ‘আমার কোনো দাবি নেই।’ ‘তুমি সুখী হও।’ এখানে আহত অহংকার নেই। বরং গভীর আত্মসংযম আছে। প্রেমের উচ্চতম স্তর সম্ভবত তখনই আসে, যখন মানুষ প্রিয়জনকে নিজের জন্য নয়, তার নিজের সুখের জন্য আশীর্বাদ করতে পারে। নজরুল-নার্গিস প্রেমের অন্যতম দিক হলো-আধ্যাত্মিকতা। পত্রের শেষাংশে প্রেম শারীরিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে আত্মিক স্তরে চলে গেছে। ‘লায়লী মজনুকে পায়নি, তবু তাদের মতো করে কেউ কারো প্রিয়তমকে পায়নি।’ এখানে প্রেম মানে একসংগে থাকা নয়। প্রেম মানে অন্তরে থাকা। এটি সুফি ও বৈষ্ণব প্রেমভাবনার সংগে সাদৃশ্যপূর্ণ।

এই পত্রের ভাষা ও শিল্পমান অত্যুৎকৃষ্টমানের। এই পত্রের ভাষা নিছক গদ্য নয়; এটি প্রায় গদ্যকবিতা। এখানে বেশ কিছু অসাধারণ চিত্রকল্প পরিদৃষ্ট হয়। যেমন: ‘বেদনার অনন্ত স্রোত’ ‘অগ্নি-বীণা’ ‘স্বর্গের পারিজাত-মন্দার’ ‘হৃদয়-বেদী’ ‘বেদনার বেদীপীঠ’ ‘অস্তমান দিনের শেষ রশি ধরে ভাঁটার স্রোতে’ ইত্যাদি। এসব চিত্রকল্প ও উপমা কেবল অলংকার নয়; এগুলো আবেগের দৃশ্যমান রূপ। মনের সুগভীর প্রেমের বাস্তব স্ফুরণ।

পত্রটির বাক্যবিন্যাসেও একটি সংগীতধর্মিতা আছে। দীর্ঘ বাক্য, পুনরাবৃত্তি, প্রশ্ন, বিস্ময় সব মিলিয়ে গদ্যটি আবৃত্তিযোগ্য হয়ে উঠেছে। তবে শিল্প-সাহিত্যের দৃষ্টিতে এই পত্রটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আধুনিক সাহিত্যসমালোচকের দৃষ্টিতে কিছু জায়গায় আত্ম-নাটকীয়তা রয়েছে। যেমন: ‘নইলে তাদের চিহ্নও থাকত না এ পৃথিবীতে।’ এই ধরনের উক্তিতে আত্মসচেতন বীরত্বের আভাস দেখা যায়। আধুনিক সংযত গদ্যে এটি কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে রোমান্টিক সাহিত্যের ঐতিহ্যে এটি দোষ নয়; বরং যুগধর্মের অংশ। সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নে এই কথা বলা যায়, এই পত্রে প্রেমের চারটি স্তর একসংগে উপস্থিত, তা হলো-প্রেম, বিরহ, স্মৃতি ও আত্মোত্তরণ।  প্রথম স্তরের প্রেমপত্রে মানুষ বলে, ‘আমি তোমাকে চাই।’ দ্বিতীয় স্তরের প্রেমপত্রে বলে, ‘আমি তোমাকে হারিয়েছি।’ কিন্তু এই পত্রে বলা হচ্ছে, ‘আমি তোমাকে পাইনি, তবু তোমাকে হারাইনি।’ সেই কারণেই এর প্রেম সাধারণ প্রেম নয়; এটি স্মৃতি ও বেদনার মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধ হওয়া প্রেম। সাহিত্যিক বিচারে এটি এমন এক প্রেমপত্র, যেখানে ব্যক্তিগত বেদনা কাব্যে রূপান্তরিত হয়েছে, এবং প্রেম অধিকার থেকে শ্রদ্ধা ও আশীর্বাদের স্তরে উন্নীত হয়েছে।

আরও পড়ুন

নজরুল-নার্গিসের প্রেমপত্র 

প্রকৃতপক্ষে রোমান্টিক প্রেম মানবজীবনের সবচেয়ে গভীর, রহস্যময় এবং শক্তিশালী অনুভূতিগুলোর একটি। এটি একজন মানুষের প্রতি আকর্ষণ, তথা, হৃদয়ের এক বিশেষ টান, যা মানুষকে আনন্দ, আশা, স্বপ্ন এবং কখনো কখনো বেদনার মধ্য দিয়ে নতুনভাবে জীবনকে অনুভব করতে শেখায়। যুগে যুগে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক এবং শিল্পীরা রোমান্টিক প্রেমকে তাদের সৃষ্টির অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কারণ প্রেম এমন এক অনুভূতি, যা মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রোমান্টিক প্রেমের শুরু সাধারণত আকর্ষণ থেকে হয়। কারও হাসি, কথা বলার ভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব কিংবা আচরণ অন্য কারও মনে বিশেষ অনুভূতির জন্ম দিতে পারে। এই আকর্ষণ ধীরে ধীরে গভীর আবেগে পরিণত হয়। তখন সেই মানুষটিকে ঘিরে নানা চিন্তা, কল্পনা এবং প্রত্যাশা তৈরি হয়। প্রিয় মানুষটির উপস্থিতি আনন্দ দেয়, আর তার অনুপস্থিতি শূন্যতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। এভাবেই একটি সাধারণ পরিচয় কখনো কখনো রূপ নেয় গভীর প্রেমে। যেমন কাজী নজরুলের সাথে মিস ফজিলাতুন্নেসার পরিচয়। এবং পরবর্তীতে কবির পক্ষ থেকে এক পক্ষীয় প্রেমের সূত্রপাত হয়। নিচের পত্রটি কবি নজরুল মিস ফজিলাতুন্নেসাকে লিখেছিলেন।

১১. ওয়েলেসলি স্ট্রিট

সওগাত অফিস

কলিকাতা

শনিবার, রাত্রি ১২টা

আজ ঈদ। ঈদ মোবারক।

অসহায় হইয়া আপনার নিকট এই পত্র লিখিতেছি। যদি বিরক্ত করিয়া থাকি, মার্জনা করিবেন। আজ ১৪ দিন হইল মোতাহার সাহেবের কোনো চিঠি পাই নাই। তাহার শেষ চিঠি পাইয়াছি ১০ই মার্চ। তাহার পর আমি তাহাকে দুইখানা পত্র দিয়াছি ১০ই ও ১৮ই মার্চ। আজো কোনো উত্তর না পাইয়া ছটফট করিতেছি। জানি না তিনি ঢাকায় আছেন কি না, না অসুখ করিয়াছে-কত কি মনে হইতেছে। আপনার শারীরিক সংবাদটুকুও তাহার মারফতই পাইতাম। বড় উদ্বিগ্নে দিন কাটাইতেছি।

আপনি যদি দয়া করিয়া-জানা থাকিলে আজই দু লাইন লিখিয়া তাঁহার খবর জানান, তাহা হইলে সবিশেষ কৃতজ্ঞ থাকিব। তিনি আমার ঐ চিঠি দুইখানা পাইয়াছেন কি-না জানেন কি? তিনি কি আমার উপর রাগ করিয়াছেন? না অন্য কারণ? জানা না থাকিলে জানাইবার দরকার নাই। আমি সওগাতের লেখা লইয়া বড় ব্যস্ত আছি। কলিকাতায় আরো দুই চারিদিন আছি। পত্র সওগাতের অফিসের ঠিকানাতেই দিবেন। আপনার শরীর খুবই অসুস্থ দেখিয়া আসিয়াছিলাম। কেবলি মনে হয়, যেন আপনার শরীর ভালো নাই। দুদিনের পরিচয়ের এতো বড় আস্পর্ধাকে আপনি হয়তো ক্ষমা করিবেন না, তবু সত্য কথাই বলিলাম।

-আপনাকে দিয়া বাংলার অন্তত মুসলিম নারী-সমাজের বহু কল্যাণ সাধন হইবে-ইহা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। তাই আপনার অন্তত কুশল সংবাদটুকু মাঝে মাঝে জানিতে বড্ডো ইচ্ছা করে। যদি দয়া করিয়া দুটি কথায় শুধু কেমন আছেন লিখিয়া জানান-তাহা হইলে আমি আপনার নিকট চির-ঋণী থাকিব। আমার ইহা বিনা অধিকারের দাবি।

আমি এখন বেশ ভালোই আছি। আর একটা কথা। আপনি বার্ষিক সওগাতের জন্য একটি গল্প দিয়াছেন ‘শুধু দুদিনের দেখা’ শীর্ষক। সওগাত সম্পাদক আমায় তাহা দেখিয়া দিতে দিয়াছেন। কিন্তু আপনার অনুমতি ব্যতীত তাহার একটি অক্ষর বদলাইবারও সাহস নাই আমার, আমি লেখাটি পড়িয়াছি। যদি ধৃষ্টতা মার্জনা করেন-তাহা হইলে আমি উহার এক-আধটু অদল-বদল করিয়া ঠিক গল্প করিয়া তুলিবার চেষ্টা করি। সামান্য এক আধটু বাড়াইয়া দিলেই উহা একটা ভালো গল্প হইবে। অবশ্য এ স্পর্ধা আমার নাই যে আপনার লেখার তাহাতে কিছুমাত্র সৌন্দর্য বা গৌরব বাড়িবে। মনে হয় গল্পটা বড্ডো তাড়াতাড়ি লিখিয়াছেন। উহা যেন আপনার অযত্ন-লালিতা।

অবশ্য আপনার অসম্মতি থাকিলে যেমন আছে তেমনটা ছাপিবেন সম্পাদক সাহেব। আপনার অমত থাকিলে স্পষ্ট করিয়া লিখিবেন, কিছু মাত্র দুঃখিত হইব না তাহাতে।

আর আমার লিখিবার কিছু নাই। আপনার খবরটুকু পাইলেই আমি নিশ্চিত হইতে পারিব।

Nazrul-2
কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

হাঁ আর একটি কথা। আমার আজ পর্যন্ত লেখা সমস্ত কবিতা ও গানের সর্বাপেক্ষা ভালো যেগুলি সেগুলি চয়ন করিয়া একখানা বই ছাপাইতেছি ‘সঞ্চিতা’ নাম দিয়া। খুব সম্ভব আর এক মাসের মধ্যেই উহা বাহির হইয়া যাইবে।

আপনি বাংলার মুসলিম নারীদের রানী। আপনার অসামান্য প্রতিভার উদ্দেশে সামান্য কবির অপার শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ ‘সঞ্চিতা’ আপনার নামে উৎসর্গ করিয়া ধন্য হইতে চাই। আশা করি এজন্য আপনার আর সম্মতিপত্র লইতে হইবে না। আমি ক্ষুদ্র কবি, আমার জীবনের সঞ্চিত শ্রেষ্ঠ ফলগুলি দিয়া পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা ব্যতীত আপনার প্রতিভার জন্য কী সম্মান করিব?

আরও পড়ুন

কাজী নজরুলের বর্ষার গানে প্রেমের শিল্পরূপ

সুদূর ভক্ত কবির এই একটি নমস্কারকে প্রত্যাখান করিয়া পীড়া দিবেন না-এই আমার আকুল প্রার্থনা।

দুই একদিনের মধ্যেই আমার লেখা সব বইগুলি পাঠাইয়া দিব আপনার। আপনার মতো বিদূষী মহিলার পড়ার তাহার উপযুক্ত নয়, তবু দিব। আপনার আঙিনায় season flower-এর গাছ দেখিয়াছিলাম যেন। তাহারও তো যত্ন নেন দেখিয়াছি। সুতরাং আমার লেখাও ফেলিবেন না, ভরসা করি।

একটু কষ্ট করিয়া আজই পত্র দিবেন। আপনার ভগ্নিদের ও ভাইকে স্নেহাশিস দিবেন।

ইতি-

নজরুল ইসলাম

মিস ফজিলাতুন্নেসা (সম্পূর্ণ নাম: ফজিলাতুন্নেসা) ছিলেন বাংলার মুসলিম সমাজের অগ্রগামী শিক্ষিত নারীদের অন্যতম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভকারী প্রথমদিকের মুসলিম বাঙালি নারীদের মধ্যে একজন এবং নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলিম নারীসমাজের শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতেন। কাজী নজরুল ইসলাম ফজিলাতুন্নেসার প্রতিভা, শিক্ষা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। এক সময় তিনি ফজিলাতুন্নেসার প্রেমে নিবদ্ধ হন। তবে তা ছিলো- একপক্ষীয় প্রেম। উপরের পত্রটিতে ‘আপনি বাংলার মুসলিম নারীদের রাণী’ বা ‘আপনাকে দিয়া মুসলিম নারী-সমাজের বহু কল্যাণ সাধন হইবে’-এ ধরনের উক্তি তার প্রতি সেই মুগ্ধতারই অমলিন প্রকাশ। সাহিত্য-ইতিহাসে ফজিলাতুন্নেসা বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ তার সংগে নজরুলের সম্পর্ককে ঘিরে বহু গবেষণা, স্মৃতিচারণ ও আলোচনা রয়েছে।

এই পত্রটির ভাব ও আবেগের গভীরতা (Themes and Emotional Depth) হৃদস্পর্শী। এই পত্রটির ভাষাগত দিক  কেবল সাধারণ কুশলবার্তা নয়; এর প্রতিটি লাইনে মিশে আছে গভীর মানবিক অনুভূতি, শ্রদ্ধা, সাহিত্যিক মান এবং এক তীব্র আকুলতা। উদ্বেগ ও ব্যাকুলতা। চিঠির শুরুতেই নজরুলের পরম বন্ধু মোতাহার হোসেনের (ফজিলাতুন্নেসার অঘোষিত অভিভাবক) কোনো সংবাদ না পেয়ে কবির তীব্র মানসিক ছটফটানি ও উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে। সেই বিষয়টি জানার জন্য কবি ফজিলাতুন্নেসাকে পত্র প্রেরণ করেন। সেই পত্রে ছিলো কবির অগাধ শ্রদ্ধা ও বিনয়। কবি তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের প্রেক্ষাপটে ফজিলাতুন্নেসার সাহিত্যিক ও সামাজিক অবদানকে কতটা উচ্চে স্থান দিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট। তিনি ফজিলাতুন্নেসাকে ‘বাংলার মুসলিম নারীদের রাণী’ বলে সম্বোধন করেছেন এবং নিজের প্রতিভাকে তার সামনে ‘ক্ষুদ্র’ বলে প্রকাশ করেছেন। এটি কবির স্বভাবসুলভ বিনয় ও নারীর প্রতি অসীম শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। সম্পাদনা ও সাহিত্যিক সততা নজরুলের মাঝে ছিলো ব্যাপক। তাই ফজিলাতুন্নেসার ছোটগল্প ‘শুধু দুদিনের দেখা’র পরিমার্জনের ব্যাপারে কবি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল। লেখাটির সাহিত্যিক মানোন্নয়নের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তিনি বারবার অনুমতি চেয়েছেন, যেন লেখকের নিজস্বতায় কোন আঘাত না লাগে। এই পত্রের আরেকটি বিশেষ দিক হলো কবি জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘সঞ্চিতা’ কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গের আবেগ। শ্রেষ্ট এই গ্রন্থটি ফজিলাতুন্নেসার নামে উৎসর্গ করার যে আকুল ইচ্ছা ও ‘অধিকারের দাবি’ কবি জানিয়েছেন, তা এক অনন্য ঐতিহাসিক মুহূর্তকে ধারণ করে। (চলবে…)

লেখক: নজরুল গবেষক ও কলামিস্ট