১৩২৮-এর ৩রা আষাঢ় নজরুল ইসলামের সঙ্গে নার্গিস আসার খানম ওরফে সৈয়দা খাতুনের আকদ হয়। এই বিবাহ স্থায়ী হয়নি। উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। নজরুল পরে ১৯২৪-এর ২৪শে এপ্রিল প্রমীলাকে বিয়ে করেন। নজরুল নার্গিসের বিবাহ বিচ্ছেদের পনেরো বছর পর নার্গিস নজরুলকে একটি চিঠি দেন তার উত্তরে নজরুল নার্গিসকে এই চিঠি লেখেন।।
106, Upper Chitpur Road
`Gramophone Rehearsal Room’
Calcutta
1.7.37
কল্যাণীয়াসু!
তোমার পত্র পেয়েছি-সেদিন নববর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে। মেঘ-মেদুর বারিধারার প্লাবন নেমেছিল-তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পার। আষাঢ়ের নব গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনর বছর আগে এমনি আষাঢ়ে এমনি মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছিলো কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে, মালবিকার দেশে তাঁর প্রিয়ার কাছে। এই মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চয়। এই আষাঢ় আমার কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে। যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দিই।
তুমি বিশ্বাস কর, আমি যা লিখছি তা সত্য। লোকের মুখে শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাক, তা হলে আমায় ভুল বুঝবে-আর তা মিথ্যা। তোমার উপর আমি কোনো ‘জিঘাংসা’ পোষণ করি না-এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। (আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি-তা দিয়ে তোমার কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি অগ্নি-বীণা বাজাতে পারতাম না-আমি ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণ-রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথমে দেখেছিলাম, সে রূপ আজো স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মতো চির-অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের আগুন বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি।
তুমি ভুলে যেও না, আমি কবি-আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি। অসুন্দর, কুৎসিত সাধনা আমার নয়। আমার আঘাত বর্বরের কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয়। আমার অন্তর্যামী জানেন (তুমি কি জানো বা শুনেছো, জানি না) তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোনো অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবিও নেই।
আমি কখনো কোনো ‘দূত’ প্রেরণ করিনি তোমার কাছে। আমাদের মাঝে যে অসীম ব্যবধানের সৃষ্টি হয়েছে, তাঁর ‘সেতু’ কোনো লোক তো নয়ই-স্বয়ং বিধাতাও হতে পারেন কি না সন্দেহ। আমায় বিশ্বাস কর, আমি সেই ‘ক্ষুদ্র’দের কথা বিশ্বাস করিনি। করলে পত্রোত্তর দিতাম না। তোমার উপর আমার কোনো অশ্রদ্ধাও নেই, কোনো অধিকারও নেই-আবার বলছি। আমি যদিও গ্রামোফোনের ট্রেড মার্ক ‘কুকুরে’র সেবা করছি, তবুও কোনো কুকুর লেলিয়ে দিই নাই। তোমাদেরই ঢাকার কুকুর একবার আমার কামড়েছিল আমার অসাবধানতায়, কিন্তু শক্তি থাকতেও আমি তার প্রতিশোধ গ্রহণ করিনি-তাদের প্রতি আঘাত করিনি।
আরও পড়ুন
কাজী নজরুল ইসলামের পত্রের শিল্পরূপ
সেই কুকুরদের ভয়ে ঢাকায় যেতে আমার সাহসের অভাবের উল্লেখ করেছ, এতে হাসি পেল। তুমি জান, ছেলেরা (যুবকেরা) আমায় কত ভালোবাসে। আমারই অনুরোধে আমার ভক্তরা ক্ষমা করেছিল। নইলে তাদের চিহ্নও থাকত না এ পৃথিবীতে। তুমি আমায় জানবার যথেষ্ট সুযোগ পাওনি, তাই এ কথা লিখেছ... যাক তুমি রূপবতী, বিত্তশালিনী, গুণবতী, কাজেই তোমার উমেদার অনেক জুটবে-তুমি যদি স্বেচ্ছায় স্বয়ম্বরা হও, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। আমি কোন অধিকারে তোমায় বারণ করব-বা আদেশ দেব? নিষ্ঠুরা নিয়তি সমস্ত অধিকার থেকে আমায় মুক্তি দিয়েছেন।
তোমার আজকার রূপ কি, জানি না। আমি জানি তোমার সেই কিশোরী মূর্তিকে, যাকে দেবীমূর্তির মতো আমার হৃদয়-বেদীতে অনন্ত প্রেম অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলে না। পাষাণ দেবীর মতোই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদী-পীঠ।... জীবনভরে সেইখানেই চলেছে আমার পূজা-আরতি। আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ, তাই তাকে পেতে চাইনে। জানিনে হয়তো সে রূপ দেখে বঞ্চিত হবো, অধিকতর বেদনা পাব, তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি।
দেখা? না-ই হলো এ ধূলির ধরায়! প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যই আমায় ভালোবাসো, আমাকে চাও, ওখানে থেকেই আমাকে পাবে। লায়লী মজনুকে পায়নি, তবু তাদের মতো করে কেউ কারো প্রিয়তমকে পায়নি। আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরাতন কথা হলেও পরম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো তা হলে তোমার মতো ভাগ্যবতী কে আছে? তারি মায়া স্পর্শে তোমায় সকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে। দুঃখ নিয়ে একই ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয় না। মানুষ ইচ্ছে করলে সাধনা দিয়ে তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুল-রূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যদি কোনো ভুল করে থাকো জীবনে এই জীবনেই তার সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ, মুক্তি; তবেই হবে সর্ব দুঃখের অবসান। নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা করো। স্বয়ং বিধাতা তোমার সহায় হবেন। আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতিক্রম করে উর্ধ্বলোকে-সেখানে গেলে পৃথিবীর সকল অসম্পূর্ণতা সকল অপরাধ ক্ষমা সুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা দেয়।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল পনের বছর আগেকার কথা। তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্র সুন্দর ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল; তোমার সেই তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজো অনুভব করতে পারি। তুমি কি চেয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিল জল, হাতে সেবা করার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রীবিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের জন্য করুণ মিনতি। মনে হয় যেন কালকার কথা। মহাকাল সে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারলে না। কী উদগ্র অতৃপ্তি; কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সেদিন এসেছিল। সারা দিনরাত আমার চোখে ঘুম ছিল না। যাক-আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষ রশি ধরে ভাঁটার স্রোতে।
তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করো না। তোমাকে লেখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি বিশ্বাস কর, আমার অক্ষয় আশীর্বাদী কবচ তোমার ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্তি পাও-এই প্রার্থনা। আমার যতো মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি ততো মন্দ নই-এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ। ইতি-
নিত্য শুভার্থী
নজরুল ইসলাম
P.S. আমার ‘চক্রবাক’ নামক কবিতা-পুস্তকের কবিতাগুলো পড়েছ? তোমার বহু অভিযোগের উত্তর পাবে তাতে। তোমার কোনো পুস্তকে আমার সম্বন্ধে কটুক্তি ছিলো। ইতি-
‘Gentleman’
এই পত্রটির সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো প্রেমের পরিণত আত্মস্মৃতি। এখানে প্রেম মিলনের আকাঙ্ক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে বেদনা, শ্রদ্ধা, ক্ষমা, স্মৃতি ও আত্মোত্তরণের স্তরে পৌঁছেছে। ফলে এর রোমান্টিকতা সাধারণ প্রেমপত্রের রোমান্টিকতা নয়; এটি গভীর, ট্র্যাজিক এবং আধ্যাত্মিক রোমান্টিকতা। এটি প্রেম নয়; এটি প্রেমোত্তর। পত্রটির শুরু থেকেই প্রকৃতি ও অন্তর্জগত একাকার হয়ে গেছে। ‘মেঘ-মেদুর বারিধারার প্লাবন নেমেছিল-তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পার। আষাঢ়ের নব গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল।’ বর্ষা এখানে আবহাওয়া নয় একেবারেই, প্রেমিকের মনের অবস্থা। আষাঢ়ের মেঘ কবির কাছে স্মৃতির দূত। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মেঘদূত-এর প্রসঙ্গ টেনে আনেন এবং নিজের বিরহকে সেই চিরন্তন বিরহের ধারার সংগে সংযুক্ত করেন। রোমান্টিক সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত বেদনার মহাজাগতিকীকরণ। এখানে ব্যক্তিগত প্রেমবেদনা প্রকৃতি, পুরাণ ও কাব্যের মধ্যে স্থান পেয়েছে। এতে প্রেমের গভীরতা স্বমহিমায় ফুটে উঠেছে।
এই পত্রে প্রেমের গভীরতা বোঝা যায় একটি বিশেষ কারণে, তা হলো-প্রেমিক এখনও প্রেমিকাকে ভালোবাসেন, কিন্তু তাকে একান্তে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেছেন। কবি লিখছেন, ‘তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোনো অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবিও নেই।’ এই বাক্যের মধ্যে দীর্ঘ তপস্যার ফল রয়েছে। সাধারণ প্রেমে অধিকারবোধ থাকে। এখানে অধিকারবোধ নেই। সাধারণ প্রেমে প্রাপ্তির বাসনা থাকে। এখানে প্রাপ্তির বাসনাও নেই। সাধারণ প্রেমে প্রত্যাখ্যানের পরে ক্ষোভ জন্মায়। এখানে ক্ষোভও নেই। অর্থাৎ, এই অমর প্রেম, অধিকার থেকে শ্রদ্ধায় উন্নীত হয়েছে। ফলে প্রেমিকার আদর্শায়ন হয়েছে। প্রেমিক এখন বাস্তব নারীকে নয়, স্মৃতির নারীকে ভালোবাসেন। তাই আক্ষেপের সুরে নজরুল বলেন, ‘তোমার সেই কিশোরী মূর্তিকে, যাকে দেবীমূর্তির মতো আমার হৃদয়-বেদীতে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম।’ এখানে কবির কাছে প্রেমিকা মানুষ নন; প্রায় দেবীস্বরূপ। এই প্রেমিক-প্রেমিকার এই আদর্শায়ন রোমান্টিক সাহিত্যের একটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। বাস্তব মানুষ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু আদর্শ প্রেমিক চিরকাল অমলিন থাকে। তাই কবি বলেন, ‘আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা।’ এটি নিষ্ঠুর বাক্য নয়। এর অর্থ হলো বর্তমান বাস্তব মানুষটির চেয়ে স্মৃতির মানুষটি তার কাছে অধিক সত্য। তাই নার্গিস-নজরুল প্রেম বিরহের মহিমায় ভাস্বর। তবে এই পত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত বিরহের শিল্পায়ন। ‘তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি অগ্নি-বীণা বাজাতে পারতাম না।’ এখানে প্রেমিকা শুধু প্রেয়সী নন, সৃষ্টিশক্তির মহা-উৎস। এই বিরহ নজরুলকে ধ্বংস করেনি। বিরহ তাকে বিশ্বকবি করেছে। অমর করেছে। রোমান্টিক সাহিত্যে বিরহের এই ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বেদনা সৃষ্টির জন্ম দেয়। প্রেমের ব্যর্থতা শিল্পের সফলতা হয়ে ওঠে। (চলবে…)
লেখক: লেখক: নজরুল কাব্যসংগীতে পিএইচডি; নজরুল গবেষক; বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার




