Dhaka Mail Logo

কৃষি ও পরিবেশ

বৃক্ষমেলায় দুই লাখ টাকার বনসাই

মাহফুজুর রহমান

১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম

মাত্র চার থেকে পাঁচ ফুট উঁচু একটি গাছ। অথচ দেখে মনে হবে বহু বছরের পুরোনো বিশাল এক গাছ। ডালপালা, শিকড়, কাণ্ড সবই যেন প্রকৃতির বাস্তব রূপের ক্ষুদ্র সংস্করণ। রাজধানীর জাতীয় বৃক্ষমেলায় এমন অসংখ্য বনসাই দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে। তবে শুধু সৌন্দর্য নয়, এসব বনসাইয়ের দামও রীতিমতো চমকে দিচ্ছে। মেলায় অধিকাংশ বড় মাপের বনসাইয়ের দাম রাখা হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা।

মেলায় প্রবেশ করলেই বিভিন্ন স্টলে সাজানো শতাধিক বনসাই চোখে পড়ে। কোথাও বিশাল গাছের আদল, কোথাও শতবর্ষী গাছের অবয়ব, আবার কোথাও গাছের ক্ষুদ্র সংস্করণ। দূর থেকে দেখলে এগুলোকে সাধারণ গাছ মনে হলেও কাছে গেলেই বোঝা যায়, ছোট একটি টবের মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে শিল্পীর মতো যত্নে গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিটি বনসাই।

এসব বনসাইয়ের সামনে থেমে যাচ্ছেন প্রায় সব দর্শনার্থী। কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ বিক্রেতাদের কাছ থেকে দাম ও পরিচর্যার কৌশল জানতে চাইছেন। দাম জানার পর অনেকের চোখ-মুখে ফুটে উঠছে বিস্ময়।

মেলায় অংশ নেওয়া একটি নার্সারির স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘একটি বড় বনসাই তৈরি করতে ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। শুধু গাছ লাগালেই বনসাই হয় না। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময় পরপর শিকড় ছাঁটাই, ডালপালা কেটে আকৃতি দেওয়া, বিশেষ তার দিয়ে বাঁক তৈরি, টব পরিবর্তন, সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। বছরের পর বছর একইভাবে পরিচর্যা করার ফলেই একটি বনসাই শিল্পকর্মে পরিণত হয়।’

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মেলায় ছোট বনসাই তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়েছে। মাঝারি আকারের বনসাই ২০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর বড় ও পরিণত বনসাইয়ের দাম এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। কিছু বিশেষ সংগ্রহের বনসাইয়ের মূল্য আরও বেশি হতে পারে।’ 

 

আরেক বিক্রেতা মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘অনেকে দাম শুনে অবাক হন। কিন্তু একটি বনসাইয়ের পেছনে যে সময়, শ্রম এবং দক্ষতা ব্যয় হয়, সেটি বিবেচনা করলে দাম অস্বাভাবিক নয়। সাধারণ গাছ কয়েক বছরে বড় হয়, কিন্তু বনসাইকে ছোট রেখেই তার বয়স ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে হয়। এটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।’

মেলায় ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বনসাইয়ের ছবি দেখেছি। কিন্তু এত বড় সংগ্রহ একসঙ্গে আগে দেখিনি। দুই লাখ টাকার বনসাই দেখে প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। পরে বিক্রেতার কাছ থেকে শুনলাম, একটি গাছ তৈরি করতে ২০ বছরেরও বেশি সময় লেগেছে। তখন দামটা কিছুটা স্বাভাবিক মনে হয়েছে।’

দর্শনার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘বনসাই শুধু একটি গাছ নয়, এটি একটি জীবন্ত শিল্প। প্রতিটি গাছের আকৃতি আলাদা, প্রতিটির মধ্যে শিল্পীর ছোঁয়া রয়েছে। কিনতে না পারলেও এমন গাছ কাছ থেকে দেখা একটি ভিন্ন অভিজ্ঞত।’

বিক্রেতাদের মতে, দেশের বনসাইপ্রেমীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে ছাদবাগান, অভিজাত বাসাবাড়ি, করপোরেট অফিস, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্যবর্ধনে বনসাইয়ের ব্যবহার বেড়েছে। অনেক সংগ্রাহক নির্দিষ্ট প্রজাতির পুরোনো বনসাই সংগ্রহ করতে আগ্রহী হওয়ায় বাজারেও এর মূল্য বাড়ছে।

তারা জানান, বনসাই তৈরিতে শুধু সময় নয়, প্রয়োজন বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ধৈর্য। একটি ভুল ছাঁটাই বা পরিচর্যার ত্রুটিতে বছরের পর বছর লালন করা গাছ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি বনসাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ সময়ের শ্রম, অভিজ্ঞতা এবং নান্দনিক চিন্তার সমন্বয়।

যদিও টানা বৃষ্টির কারণে এবারের জাতীয় বৃক্ষমেলায় সামগ্রিকভাবে ক্রেতার উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম, তবুও বনসাই স্টলগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে দামি বনসাই কিনতে না পারলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে সেগুলো দেখছেন, ছবি তুলছেন এবং বনসাই তৈরির কৌশল সম্পর্কে জানছেন। বিক্রেতাদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে ফিরলে শৌখিন সংগ্রাহকদের আনাগোনা বাড়বে এবং উচ্চমূল্যের বনসাইয়ের বিক্রিও গতি পাবে।

প্রকৃতিকে ছোট পরিসরে শিল্পের রূপ দেওয়ার এই অনন্য কৌশলই বনসাইকে শুধু একটি গাছ নয়, বরং ধৈর্য, নান্দনিকতা ও দীর্ঘদিনের যত্নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। আর সেই কারণেই জাতীয় বৃক্ষমেলায় দুই লাখ টাকার বনসাই শুধু একটি পণ্য নয়, দর্শনার্থীদের কাছে বিস্ময় আর আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

এম/ক.ম