পার্কে ফুড ভ্যান: ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা, কাউন্সিলরের ভিন্ন সুর

প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৫৫ পিএম
পার্কে ফুড ভ্যান: ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা, কাউন্সিলরের ভিন্ন সুর

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাহাদুর শাহ পার্কের ভেতরে ফুড ভ্যান চালু করাকে কেন্দ্র করে ক্রমেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে। পার্কে নিয়মিত শরীর চর্চাকারীদের একাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দফায় দফায় কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। যেকোনো মূল্যে তারা দোকান নির্মাণ ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছেন। প্রয়োজনে আদালতে যাওয়ারও চিন্তা করছেন তারা।

তবে স্থানীয় কাউন্সিলর বলছেন, অনেক টাকা খরচ করে পার্কটি সাবেক মেয়রের (সাঈদ খোকন) সময়ে আধুনিকায়ন করা হলেও এটি অনেকটা অনিরাপদ হয়ে গেছে। তাই ফুড ভ্যান করার জন্য যাদের ইজারা দেওয়া হয়েছে তারা পার্কটি পরিচ্ছন্ন রাখবে। নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকবে। তখন ডেন্ডিখোরদের হাত থেকেও পার্কটি নিরাপদ রাখবে।

নিয়মিত পার্কে আসেন এমন লোকজন বলছেন, ঐতিহ্যবাহী পার্কটির ভেতরে স্থায়ীভাবে খাবারের দোকান বসানো হলে সৌন্দর্য নষ্ট হবে। পার্কের পরিবেশও খারাপ হবে। ভেতরে খাবার রান্না করা হলে এর প্রভাব গাছের ওপর পড়বে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এখানে খাবারের দোকানের জন্য ইজারা দেওয়ারও নিন্দা করছেন তারা।

park2

পরিবেশবাসী সংগঠনের নেতারাও বলছেন, পার্কের অভ্যন্তরে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলে তা সৌন্দর্য নষ্ট করবে। তাই এমন কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ তাদের।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ সেলিম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ইজারাদাররা পার্কটিকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার কথা বলেছে। নিজেদের দশজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে সবসময় সুন্দর রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আরও লাইটিং থাকবে। এরপর যদি দেখা যায় আসলে তারা পার্কের ক্ষতি করছে তখন সরিয়ে দেওয়া হবে। এতে সমস্যার কিছু নেই।’

আরও পড়ুন: ঐতিহ্যের ভিক্টোরিয়া পার্ক: ছিনতাইয়ের হটস্পট, ডেন্ডিখোরের আস্তানা

বাহাদুর শাহ পার্কের মূল স্মৃতিসৌধটি চারটি পিলারের উপর দাঁড়ানো চারকোণা একটি কাঠামো। উপরে রয়েছে একটি ডোম। অপর পাশে রয়েছে একটি ওবেলিস্ক, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ভারতবর্ষের সম্রাজ্ঞী হিসেবে রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহন মনে করিয়ে দেয়। ঠিক সেই স্তম্ভটির পাশেই করা হচ্ছে রান্নাঘর। এর সামনে হবে দোকান।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, খাবার তৈরি হলে আগুনের তাপে গাছ মরে যাবে। তবে কাউন্সিলর সেলিমের দাবি, ‘ভেতরে কোনো রান্নাঘর থাকবে না। তারা খাবার তৈরি করে আনবে। এখানে বিক্রি করবে। আর পার্কটি দেখাশোনা করবে।’

নিয়মিত পার্কে হাঁটাচলা করা পাশের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রঞ্জন বিশ্বাস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৭০ বছর। বয়স হওয়ার পর থেকে পার্কটিতে এমন নোংরা পরিবেশ কখনও দেখিনি। নেশাগ্রস্ত ছেলে-মেয়েরা শুয়ে থাকে যেখানে সেখানে। এখন নতুন করে দোকান করে আরও পরিবেশ নষ্টের চেষ্টা চলছে। কারা কোথা থেকে, কিভাবে টেন্ডার নিয়েছে তাও জানি না। আমরা চাই না এখানে কোনো দোকান হোক।’

park3

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে এই প্রথম জানলাম। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমনিতে ঢাকায় পার্ক কম। খাবারের দোকানের অভাব নেই। আজকে একজন বসাবে, কালকে অন্য একটা দোকান বসবে। তখন পার্ক তো পার্ক থাকবে না। তাই ঐতিহ্যবাহী পার্কটিকে পার্ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।’

এ ব্যাপারে পবা কোনো উদ্যোগ নেবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপাতত আমরা এ নিয়ে কোনো কর্মসূচিতে যাবো না। তবে যারা করছে তাদের প্রতি সমর্থন থাকবে।’

প্রতিবাদের পর থমকে আছে কাজ

স্থানীয়রা বলছেন, পার্কের মধ্যে স্থায়ী দোকান নির্মাণ শুরুর পর থেকে তারা প্রতিবাদ করে আসছেন। আরও কর্মসূচি পালন করবেন। গণস্বাক্ষর কর্মসূচি অব্যাহত আছে। প্রয়োজনে এর নির্মাণবন্ধে তারা আদালতে রিট করবেন।

আরও পড়ুন: ভিক্টোরিয়া পার্কের ভেতরে খাবারের দোকান বসাচ্ছে সিটি করপোরেশন

এদিকে দোকান নির্মাণের শুরু থেকেই বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রথম দিনে স্থাপনা ভেঙে ফেললেও পরে পুলিশ প্রহরায় তারা কাজ করেছে। বৃহস্পতিবার এখানে লোহার একটি কাঠামো তৈরি শেষ করার পর গত দুই দিনে আর কোনো কাজ হয়নি।

park4

এরমধ্যে শুক্রবার সকালে পার্কের চারপাশে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে বাহাদুর শাহ পার্ক সংরক্ষণ পরিষদ। শনিবার (১ অক্টোবর) পার্কের মধ্যে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বড় আকারের ব্যানার লাগানো হয়েছে। যাতে লেখা আছে- পার্কের মধ্যে কোনো ফুডভ্যান/রেস্টুরেন্ট নির্মাণের কাজ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

অন্যদিকে যেখানে লোহার তৈরি স্থাপনা করা হয়েছে সেখানে ছোট করে দুটে ব্যানার লাগানো আছে। যাতে লেখা আছে- ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃক অনুমোদিত ও ইজারাকৃত ফুডভ্যান নির্মাণের কাজ চলছে।

একটি সূত্রে জানা গেছে, রাজিব নামের একজন উত্তরার বাসিন্দা দোকানটির মালিক।

বিষয়টি নিয়ে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিনকে ফোন করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

বিইউ/জেবি