সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতের আগমনী বার্তা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, কুবি
প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতের আগমনী বার্তা
ছবি: সংগৃহীত

ঋতুরা আসে, ঋতু যায়। কিন্তু প্রতিটি ঋতু যেন কুবির প্রকৃতির ক্যানভাসে রেখে যায় আলাদা রঙের ছাপ। শরতের সাদা কাশফুল পেরিয়ে হেমন্ত যখন ধীরে ধীরে শীতের দুয়ারে এসে দাঁড়ায়, তখন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতিও বদলে নেয় তার চেনা সাজ। ভোরের কুয়াশার নরম চাদর, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির, হালকা উত্তরের বাতাস আর গাছের ফাকে এক টুকরো রোদ সব মিলিয়ে লালমাটির এই ক্যাম্পাসে জানান দেয়, শীতের বার্তা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক স্বতন্ত্র দৃশ্য। লালমাটির বিস্তীর্ণ পথ, ছোট-বড় টিলা, সবুজের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অরণ্য, কৃষ্ণচূড়ার গাছের সারি আর দূরে ছড়িয়ে থাকা খোলা মাঠ ক্যাম্পাসের প্রতিটি বাঁকেই প্রকৃতি তার নিজস্ব গল্প বলে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সেই গল্পের ভাষাও বদলে যায়। হেমন্তের শেষপ্রহরে এসে সেই ভাষায় যোগ হয় শীতের মৃদু সুর।

সকালের ক্যাম্পাসে তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি দিনের কোলাহল। রাতের অন্ধকার সরিয়ে সূর্য যখন লালমাটির বুকের ওপর সোনালি রোধ ছড়িয়ে দেয়, তখন ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো ক্ষুদ্র আয়নার মতো ঝলমল করে। মনে হয়, রাতের নীরবতায় প্রকৃতি বুঝি অদৃশ্য হাতে লিখে গেছে সকালের জন্য ছোট ছোট বার্তা।

ভোরের নরম আলোয় শিশিরভেজা মাঠ যেন কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসা কোনো সবুজ স্বপ্ন। শিক্ষার্থীদের কেউ হাঁটছেন, কেউ দৌড়াচ্ছেন, কেউ কেউ দল বেধ খেলায় মগ্ন, কেউ দূর থেকে দাঁড়িয়ে তা উপভোগ করছেন সকালের নির্মলতা। ব্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের মাঝেও এমন সকাল মানুষকে কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দেয়।

উঁচু তালগাছের ডালে ডালে ঝুলে থাকে বাবুই পাখির বাসা। বাতাসে দুলতে থাকা সেই বাসাগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয়, আকাশের নিচে ঝুলে আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘর। বাবুইয়ের নিপুণ শিল্পের বুনন প্রকৃতির স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। মানুষের হাতে নির্মিত ভবনের পাশে পাখির তৈরি এই ছোট্ট সংসার মনে করিয়ে দেয় ক্যাম্পাস শুধু মানুষের নয়।

'ভোরের কৃষ্ণচূড়া রোড' যার নামের মধ্যেই ঋতুস্মৃতি লুকিয়ে আছে। বছরের অন্য সময়ে যে পথ নীরবে শিক্ষার্থীদের চলার সঙ্গী হয়ে থাকে, ঋতু বদলের সঙ্গে তার আবহও পাল্টে যায়। কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে তখন রক্তিম ফুল নেই কিন্তু শীতের আগমনে প্রকৃতি যেন তার উজ্জ্বল পোশাক সরিয়ে নিয়ে এসেছে শান্ত, সংযত এক সাজে। পথটি এগিয়ে গেছে শহীদ মিনারের দিকে যেখানে এসে ক্যাম্পাসের প্রকৃতি ও ইতিহাস যেন পাশাপাশি দাঁড়ায়।

ক্যাম্পাসের হালকা উঁচু-নিচু টিলাগুলো শীতের আবহকে আরও আলাদা করে তোলে। কোথাও পথ একটু ওপরে উঠেছে, কোথাও আবার নেমে গেছে নিচু জমির দিকে। টিলার ঢালে ঘাস, ঝোপঝাড় আর গাছপালার ভেতর দিয়ে বয়ে যায় সকালের বাতাস। কুয়াশার আবরণে দূরের দৃশ্য যখন কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে আসে, তখন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে মনে হয় প্রকৃতি সকল রূপ কুবিতে উজাড় করে দিয়েছেন। 

তবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীত শুধু কুয়াশা, শিশির কিংবা মৃদু ঠান্ডা বাতাসের গল্প নয়। এটি অনেকের স্মৃতিরও ঋতু। যে শিক্ষার্থী প্রতিদিন কৃষ্ণচূড়া রোড ধরে ক্লাসে যান, যে বন্ধুদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় মাঠে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করেন, যে ভোরে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর হাঁটেন কিংবা বাবুইয়ের বাসার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ থেমে যান একদিন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে গেলেও এই দৃশ্যগুলো তার সঙ্গে থেকে যাবে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাই শীতের আগমন কেবল ঋতু পরিবর্তনের খবর নয়। এটি প্রকৃতির নীরব আয়োজন, ক্যাম্পাসজীবনের নতুন রঙ, স্মৃতির পাতায় জমে থাকা এক কোমল অধ্যায়। লালমাটির পথ যখন কুয়াশায় আবছা হয়ে যায়, তালগাছে বাবুইয়ের বাসা বাতাসে দোলে, কেন্দ্রীয় মাঠের ঘাসে শিশির ঝিলমিল করে আর কৃষ্ণচূড়া রোড পেরিয়ে সূর্যের আলো শহীদ মিনারের গায়ে এসে পড়ে তখন মনে হয়, সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

এমআর/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর