মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

দেশে তীব্র গরম— সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কবে, কোথায়, কত ছিল?

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম

শেয়ার করুন:

দেশে তীব্র গরম— সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কবে, কোথায়, কত ছিল?
ঢাকার হাতিরঝিলের পানিতে তীব্র গরমের সময় খেলা করছে শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত

দেশে আগে এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহের সময় হলেও নানা কারণে এখন তা দীর্ঘায়িত হতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি অতীতে অক্টোবর নভেম্বর মাস থেকেই ঠান্ডা অনুভূত হতে শুরু করলেও এখন সেই চিত্র বদলে গেছে।

এখন শুধু বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠ মাসে নয়, বর্ষার শেষে – সেপ্টেম্বর মাসেও দুপুরের তপ্ত রোদে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, মরীচিকা দেখে ভ্রম হয়, বাইরে বেরোলেই গরম বাতাসের হলকা এসে মুখে পড়ে।


বিজ্ঞাপন


অঞ্চলভেদে গরমের অনুভূতির তীব্রতা, অর্থাৎ কম-বেশি অবশ্যই রয়েছে। তবে এখনো এপ্রিল মে মাসকে তীব্র গরমের মাস বলে মনে করা হয়। এই ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কবে, কোথায় রেকর্ড হয়েছিলো কিংবা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মানেই কি সবচেয়ে বেশি গরম অনুভূত হওয়া?  

Taapmatra
ঢাকায় তাপপ্রবাহের সময় কাক পানি পান করছে। ছবিটি ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল তোলা। 

সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কবে, কোথায়, কত ছিল?
বর্তমানে দেশজুড়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের মোট ৪৮টি আবহাওয়া স্টেশন রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের কাছে সেই ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় থেকে, অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড আছে।

তাপমাত্রার রেকর্ড থেকে দেখা যায়, দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৯৭২ সালের ১৮ মে, রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক এক ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখনো পর্যন্ত এটিই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও রেকর্ড হয় রাজশাহীতেই, ১৯৮০ সালের এপ্রিলে যা ছিল ৪৪ দশমিক চার ডিগ্রি সেলসিয়াস।   


বিজ্ঞাপন


তৃতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা রেকর্ড হয় বগুড়ায় ১৯৮৯ সালের এপ্রিলে। একই তাপমাত্রা পাওয়া যায় ঈশ্বরদীতে ১৯৭০ সালের মে মাসেও। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ৪৩ দশমিক নয় ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৫৮ সালের মে মাসে বগুড়ায় রেকর্ড করা হয়। এরপর ৪৩ দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয় একাধিকবার, ১৯৬৩ সালের যশোরে, ১৯৮৫ সালের রাজশাহীতে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে যশোরে। সবগুলোই এপ্রিলে। 

Taapmatra_ii
ঢাকার শেরে-ই-বাংলা নগরে সংসদ ভবন অবস্থিত। সংসদ ভবন এলাকায় রাস্তার পাশে সারি সারি প্রচুর কৃষঞ্চূড়া গাছ রয়েছে। গরমে এইসব গাছে লাল রঙা ফুল আসে। 

 
এ ছাড়া ২০২৪ সালের এপ্রিলে চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ওঠে ৪৩ দশমিক সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মাঝে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। ওই একই মাত্রার তাপমাত্রা ১৯৮৯ সালের মে মাসে রাজশাহীতেও রেকর্ড করা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে যে ওই বছরগুলোতে তাপমাত্রার পারদ এত উপরে উঠলো কেন?

এর উত্তরে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, তীব্র তাপমাত্রা থেকে বাঁচার উপায় হলো দমকা বাতাস-ঝড়ো হাওয়া। যে বছর এগুলো বেশি থাকে, সে বছর গরম নিয়ন্ত্রণে থাকে।

"যে যে বছরগুলোতে তাপমাত্রা বেশি রেকর্ড হয়েছে, ওই বছর কালবৈশাখী ঝড় কম হয়েছিল। অথবা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গে হয়তো বেশি তাপমাত্রা ছিল এবং সেখান থেকে হয়তো বাংলাদেশে লু হাওয়ার অনুপ্রবেশ ছিল," ব্যাখ্যা করেন মল্লিক। 

তবে এটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না ওই স্থানগুলোর বাইরে অন্য কোথাও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল না। কারণ দেশের প্রতিটি স্থানের তাপমাত্রা পরিমাপ করার মতো স্টেশন ছিল না, বা এখনও নেই। যেসব স্থানে গাছপালা কম, কারখানা বা ইটভাটা বেশি, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, ডিজেলচালিত যানবাহন চলে, সেগুলোতে স্টেশন না থাকলেও সেসব স্থানের তাপমাত্রা বেশি হতে পারে। 

Taapmatra_iii
২০২৪ সালের এপ্রিলের শেষ নাগাদ ঢাকায় তীব্র তাপদাহের সময় একটি সড়কের গাছের নীচে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন এক ব্যক্তি।

 

এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক, "আসল চিত্রটা কী, আমরা তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে সমতলের একটি স্টেশনের এরিয়া কাভারেজ সাধারণ ১৮-২০ কিলোমিটার। পাহাড়ি এলাকার স্টেশনের এরিয়া কাভারেজ আবার ৮-১০ কিলোমিটার।"

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অসহনীয় তাপমাত্রা, কেন?
এই ভূখণ্ডের তাপমাত্রার রেকর্ড থেকে এটি স্পষ্ট যে ঘুরে-ফিরে মাত্র কয়েকটি স্থানেই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। তা হলো: রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, বগুড়া ও ঈশ্বরদী। 

এমনিতেও দেশের উষ্ণতম জেলা হিসেবে রাজশাহীর পরিচিতি আছে। তবে এই তালিকায় দেশের পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের জেলা চুয়াডাঙ্গার উপস্থিতিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। 

ওই ১০টির বাইরে ১৯৯৫ সালের পহেলা মে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৩ দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওই বছরের ২৫শে এপ্রিল তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৩ ডিগ্রি। আর, এই দু'টি শীর্ষ তাপমাত্রাই পাওয়া গিয়েছিল চুয়াডাঙ্গাতেই। সর্বোচ্চ দশে না থাকলেও ১৯৮৯ সালেও একবার ৪৩ ডিগ্রি ছাড়িয়েছিল জেলাটির তাপমাত্রা। ওই বছরের চৌঠা মে'তেও চুয়াডাঙ্গার তাপমাত্রা ৪৩ দশমিক তিন ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়।

মূলত, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বছরের এই সময়ে চুয়াডাঙ্গা সহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে বরাবরই অসহনীয় তাপমাত্রা বিরাজ করে। 

আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, বাংলাদেশে এপ্রিল হচ্ছে সর্বোচ্চ গরম মাস। এই সময়ে পৃথিবী সূর্য থেকে লম্বালম্বিভাবে রশ্মি বা কিরণ পায়। 

Taapmatra_iv
তাপপ্রবাহ না থাকলেও গরমের অনুভূতির তীব্রতা বেশি হতে পারে

 

সহজ করে বলতে গেলে, এপ্রিল মাসে সূর্য থেকে বাংলাদেশের অবস্থান অন্য সময়ের তুলনায় সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। যার কারণে সূর্যের তাপ বেশিই পরে এই অঞ্চলে। তার ব্যাখ্যায় চুয়াডাঙ্গাসহ যশোর, মেহেরপুর, খুলনা অঞ্চলে বিস্তৃত সমভূমি রয়েছে। এছাড়া, এই অঞ্চলের পশ্চিমে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ। সেখানেও বিশাল এলাকা জুড়ে সমভূমি।

ফলে তাপমাত্রা প্রবাহের তিনটি পদ্ধতি রয়েছে – পরিবহন, পরিচলন এবং বিকিরণ – সমভূমি হওয়ার কারণে ওই অঞ্চলগুলো দিয়ে পরিবহন পদ্ধতিতে তাপ প্রবাহিত হয়। ফলে সরাসরি তাপ লাগে এবং পুরো অঞ্চলের তাপমাত্রা বেশি থাকে।

দ্বিতীয়ত, চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিম দিয়ে জলীয় বাষ্প প্রবেশ করায় তাপমাত্রা বাড়ে।

আবহাওয়াবিদ নাজমুল হক বলেন, বঙ্গোপসাগরের পশ্চিমঘাট হচ্ছে খুলনা, চুয়াডাঙ্গা অঞ্চল। আর বঙ্গোপসাগর হচ্ছে জলীয় বাষ্পের উৎস। বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্প এই অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে বলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অন্যান্য এলাকার তুলনায় এই এলাকায় বেশি থাকে। ফলে তাপমাত্রাও বেশি থাকে। 

তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে সূর্য থেকে চুয়াডাঙ্গার অবস্থান বা সোলার পজিশন। সূর্যের উত্তরায়নের কারণে তাপমাত্রা বাড়ে।

নাজমুল হক বলেন, পৃথিবী সাড়ে ২৩ ডিগ্রি কোণে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। ফলে ২১শে মার্চের পর থেকে ২১শে জুন পর্যন্ত উত্তর মেরুতে সবচেয়ে বেশি সূর্যের তাপ পৌঁছায়। আর বাংলাদেশ যেহেতু ২২ ডিগ্রি থেকে ২৬ ডিগ্রি এরকম অবস্থানে আছে এবং কেন্দ্র রয়েছে ২৩ ডিগ্রির কাছাকাছি। ফলে সূর্যের যে সর্বোচ্চ কিরণ, সেটা কিন্তু পড়ে এই সব অঞ্চলে।  

Taapmatra_v
তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে গেলে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়

 

তাপমাত্রা বেশি হওয়া মানেই কি বেশি গরম?
তবে কোনো স্থানে তাপপ্রবাহ কিংবা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করলেই যে সেখানে গরমের অনুভূতিও তীব্র হবে, বিষয়টি কিন্তু এমন না। তাপমাত্রা কম হলেও গরম বেশি লাগতে পারে। কারণ, গরমের অনুভূতির ক্ষেত্রে বাতাসের বেগ ও জলীয় বাষ্প হলো সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর, বলছিলেন আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক।

আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘বাতাসে জলীয় বাষ্প কম থাকলে এবং বাতাস যদি প্রবাহিত হয়, তখন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হলেও গরমের অনুভূতি কম থাকে। কিন্তু আপমাত্রা যদি অনেক কমও থাকে, কিন্তু বাতাস না থাকে আর বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি হয়, তখন মনে হয় গরমে নাভিশ্বাস উঠছে।’ 

উদাহরণ হিসেবে মল্লিক বলেন, ২০২৪ সালে ৭৬ বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে বাংলাদেশে পহেলা এপ্রিল থেকে পাঁচই মে পর্যন্ত টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহ ছিল। ওইসময় চুয়াডাঙ্গা বা রাজশাহীতে গরমের অনুভূতি অত বেশি ছিল না। কারণ সেখানে জলীয় বাষ্প কম ছিল এবং বাতাস ছিল। 

Taapmatra_vi
এপ্রিলকে উষ্ণতম মাস ধরা হয় বাংলাদেশে

 

ওই ধরনের আবহাওয়ায় গরম লাগলেও অস্বস্তি লাগবে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "এইজন্য উপকূলীয় অঞ্চলে...পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনা, কক্সবাজারে তাপমাত্রা কম থাকলেও গরমের অনুভূতি প্রচণ্ড। কারণ এগুলো সাগড়ের পাড়ে, তাই সেখানে জলীয় বাষ্পের জোগান বেশি। এজন্য তারা বেশি ঘামে, স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় থাকে, খুব অস্বস্তিতে ভোগে।"

জলীয় বাষ্প ছাড়াও যেসব কারণ গরম বাড়ায়
এছাড়া, দিনের বেলা যদি আকাশ মেঘমুক্ত থাকে, তাহলে সূর্যের কিরণকাল বেশি হবে। অর্থাৎ, সূর্যের আলোর প্রাপ্যতা যদি ৮-১০ ঘণ্টা হয়ে যায়, তখন বাতাস বেশি উত্তপ্ত হয় এবং গরম লাগে। এ নিয়ে প্রবাদও আছে – 'মেঘ কাটা রোদে গরম বেশি'। অর্থাৎ, মেঘও আছে, গরমও আছে। 

আবুল কালাম মল্লিক বলেন, “দিনের বেলা যে বরাবর মেঘ থাকে, সেখানের ভূপৃষ্ঠ ঠাণ্ডা থাকে। কিন্তু পাশের মেঘমুক্ত এলাকায় সূর্যের আলো বেশি। তাপমাত্রার ধর্ম হলো, এটি সবসময় হাই থেকে লো'তে যায়। তাই, এটি হাই থেকে লো'তে গিয়ে মেঘ কেটে দেয় এবং তখন ওই ঠাণ্ডা স্থানের তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। এ কারণেই বলা হয়, মেঘ কাটা রোদ গরমের অনুভূতি বাড়ে।”

যদিও শুধুমাত্র দিনের তাপমাত্রা দিয়েই গরমের তীব্রতা বোঝা যায় না। কারণ সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ, অর্থাৎ দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য যত কম হবে, গরম তবে বেশি অনুভূত হবে।

“পার্থক্য ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে হলে বুঝতে হবে যে গরম বেশি; পার্থক্য পাঁচ ডিগ্রি মানে গরমে নাভিশ্বাস উঠছে; পাঁচ ডিগ্রির নীচে নামার অর্থ লু হাওয়া-হিটস্ট্রোকও হয়ে যেতে পারে, এসময় ফ্লোরেও ঘুমানো যায় না, বিছানা-বালিশ সব গরম হয়ে আছে,” বলেন মল্লিক। 

আর গরমের তীব্রতা বা অনুভূতি পরিমাপের ক্ষেত্রে জলীয় বাষ্প, বায়ুর চাপ, বাতাসের গতিবেগ ও দিকের বাইরে আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। যেমন, ব্যক্তি কোন ধরনের কাপড় পরেছেন, তিনি ছেলে নাকি মেয়ে, তার বয়স কত, তিনি কী খেয়েছেন, সূর্যালোকের সময়কাল, বাইরে নাকি ঘরের ভেতরে কাজ করছেন, ইত্যাদি।

তবে কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে কোনো একটি অঞ্চলে বসবাস করে, তারা ততটাও গরম অনুভব করে না, যতটা বহিরাগতরা অনুভব করে। উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহীর স্থানীয় মানুষজন বহিরাগতদের তুলনায় কম গরম অনুভব করতে পারে। এর কারণ, অভিযোজন।

তবে আবহাওয়াবিদরা মনে করেন, প্রযুক্তির কারণে মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা কমে গেছে। যেমন, কেউ যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে বের হয়, তখন অনেক বেশি গরম লাগে। 

Taapmatra_vii
শ্রমজীবী মানুষদের জন্য তীব্র তাপপ্রবাহে কাজ করে যাওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

 

কিছু এলাকায় তাপমাত্রা সহনীয়, কারণ কী?
দেশের ময়মনসিংহ ও সিলেটের মতো কিছু অঞ্চলে গরমকালেও তাপমাত্রা সহনীয় থাকে। এর কারণ হলো এগুলোর বিস্তীর্ণ হাওর কিংবা সুউচ্চ পাহাড়। ময়মনসিংহ এলাকায় হাওড়ের মতো বিশাল জলাধার আছে। তাছাড়া, পাহাড়ের পাদদেশে হওয়ায় ওখানে মাঝে মাঝে বৃষ্টিপাত হয়। তাই তাপমাত্রা কম।

চট্টগ্রাম ও সিলেটে নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় গরম কম অনুভূত হওয়ার এটা প্রধান কারণ। আর যদি বনাঞ্চলের হিসেব করা হয়, ওইসব অঞ্চলে বনায়ন বেশি এবং আশেপাশে জলাধার আছে।

"বঙ্গোপসাগর থেকে যে জলীয় বাষ্প বাংলাদেশে প্রবেশ করে, সেটা পাহাড়ি এলাকায় বাধাপ্রাপ্ত হয়। তখন ওই জলীয়বাষ্প সমৃদ্ধ বাতাসের ঊর্ধ্বগমন ঘটে বা উপরের দিকে যায়। তারপর, ওই বাতাসের ভেতরে যে পানির কণা থাকে, তা ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে। মেঘ তৈরির পর তা পাহাড়ের সম্মুখভাগে বৃষ্টিপাত ঘটায় ও তাপমাত্রা কমায়," বলেছিলেন ড. মল্লিক।

তাছাড়া, পাহাড়ি অঞ্চলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, "পাহাড়ের একদিকে সূর্যের আলো পড়লে অন্যদিকে ছায়া পড়ে। আর, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে বাতাস প্রবাহিত হয়। দুই পাশের, মানে উত্তপ্ত বাতাস ও ঠাণ্ডা বাতাস মিশ্রিত হয়ে সেখানকার তাপমাত্রা একটু কম রাখে।"

তীব্র তাপপ্রবাহ কখন হয়?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, কোনো এলাকায় যদি তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে তাহলে তাকে বলে তীব্র তাপপ্রবাহ। তাপমাত্রা যখন ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, তাকে বলে মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে সেটিকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, কোনো জায়গার দৈনিক যে গড় তাপমাত্রা সেটি পাঁচ ডিগ্রি বেড়ে গেলে এবং পরপর পাঁচদিন তা চলমান থাকলে তাকে হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ বলা হয়।

অনেক দেশ এ সংজ্ঞা নিজের দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক করে। তবে সার্বিকভাবে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির ওপরে উঠলে শরীর নিজেকে ঠাণ্ডা করার যে প্রক্রিয়া সেটি বন্ধ করে দেয়। যে কারণে এর বেশি তাপমাত্রা হলে তা যেকোনো স্বাস্থ্যবান লোকের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। 

Taapmatra_viii
গরমে পর্যাপ্ত পানি খেতে পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

তাহলে চলতি বছরের গরমের সময়টা কেমন কাটবে? আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ বছরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে। তবে এপ্রিল মাসের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকবে।

"২০২২ থেকে ২০২৭ সাল বিশ্বব্যাপীই উষ্ণ থাকবে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশেও গরমের অনুভূতির তীব্রতা থাকবে। কিন্তু সেই তীব্রতা কোনোভাবেই ২০২৪ সালকে অতিক্রম করতে পারবে না। কারণ এ বছর কালবৈশাখী বেশি হবে। যখনই তাপ বাড়বে, তখনই বজ্রঝড় হয়ে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে," বলেন আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক।

আবহাওয়াবিদরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝে মোট ছয় থেকে আটটি তাপপ্রবাহ হতে পারে এবং এর মাঝে তিন থেকে চারটি হতে পারে তীব্র তাপপ্রবাহ। -বিবিসি বাংলা 

ক.ম/ 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর