বিশ্ব জুড়ে অ্যাপলের নতুন আইফোন ১৮ প্রো এবং আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স কেনার জন্য শপিং মলগুলোতে লম্বা লাইন পড়ে গিয়েছে। কেউ এর ক্যামেরা, কেউ আবার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে প্রায় তিন লাখ টাকার এই আইফোন কেনার কথা ভাবছেন।
শুধু তাই নয়, নতুন আইফোন ১৮ সিরিজের সবচেয়ে বেশি ট্রেন্ডে রয়েছে তার ক্যামেরা কোয়ালিটি। প্রথমবার অ্যাপল আইফোন ১৮ প্রো সিরিজের ক্যামেরায় ব্যবহার করেছে ভেরিয়েবল অ্যাপারচার। এর সঙ্গে আবার রয়েছে ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন মেইন ক্যামেরা, যেখানে অ্যাপারচার কন্ট্রোল করার সুবিধা দিয়েছে অ্যাপল।
আলো নিয়ন্ত্রণে ভেরিয়েবল অ্যাপারচারের ম্যাজিক
এই ভেরিয়েবল অ্যাপারচার আপডেটের ফলে ক্যামেরার লেন্সে কতটা আলো ঢুকবে, তা তার পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলানো যাবে। ফলে দিনের উজ্জ্বল আলো থেকে কম আলো—বিভিন্ন আলোতেই ছবি আরও ভালোভাবে তোলা যায়।
শুধু অটোমেটিক নয়, চাইলে ব্যবহারকারী নিজেও চারটি আলাদা অ্যাপারচার সেটিং বেছে নিতে পারবেন। অর্থাৎ ছবি তোলার ক্ষেত্রে মোবাইলেই আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায়।
সঙ্গে নতুন সেন্সর এবং কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফি প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবির ডিটেলিং আরও বাড়ানো যাবে বলে দাবি করেছে অ্যাপল।
সাধারণ মানুষের জন্য ক্যামেরার বিকল্প আইফোন
এবার আইফোনের ক্যামেরায় এত আপডেট আসায় অনেকের মনেই প্রশ্ন—একটি ফোনই যদি প্রায় ক্যামেরার মতো কমবেশি পারফেক্ট কোয়ালিটির ছবি তুলতে বা ভিডিও করতে পারে, তাহলে কি সত্যি ক্যামেরার প্রয়োজন রয়েছে?
এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফাররা মনে করছেন, অ্যাপলের নতুন আইফোনে ক্যামেরার এই আপডেট আসার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতের ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফিতে একটা বিরাট পরিবর্তন আসতে চলেছে।
ফটোগ্রাফারদের একাংশের দাবি, অ্যাপলের ক্যামেরার এই আপডেটে হয়তো সাধারণ মানুষ, যারা প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি করেন না, তাদের মধ্যে ক্যামেরা কেনার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে। কারণ যখন একটি ফোনেই দুর্দান্ত ক্যামেরা কোয়ালিটির সঙ্গে আরও একাধিক ফিচার পাওয়া যায়, তখন ক্যামেরা কেনার আগ্রহ কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

সেন্সরের লড়াই: সাইজ বনাম সফটওয়্যার
স্মার্টফোনের প্রযুক্তিতে কমছে অপটিক্যালের ব্যবধান, তবে ডেডিকেটেড লেন্সের রাজত্ব কিন্তু এখনও অক্ষুণ্ণ। আইফোন ১৮ প্রো-এর ৪৮ মেগাপিক্সেল সেন্সরে একটি যুগান্তকারী মেকানিক্যাল সিক্স-ব্লেড ভেরিয়েবল অ্যাপারচার যোগ করা হয়েছে। এর ফলে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি আর স্মার্টফোনের মাঝে দূরত্ব আরও কিছুটা কমে গিয়েছে।
তবুও পেশাদার এবং যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, পকেটে রাখার মতো একটা ডিভাইস কি সত্যিই একটা ডেডিকেটেড মিররলেস ক্যামেরার বিকল্প হতে পারে?
অ্যাপলের এই নতুন প্রযুক্তি প্রচলিত অপটিক্সের অনুকরণ করলেও, দেখা যায় যে নিখুঁত ছবির গুণমানের দিক থেকে মিররলেস সিস্টেম এখনও এক নম্বরে রয়েছে। সেন্সরের সাইজ ও সফটওয়্যারের বিতর্কের মূলে রয়েছে এর আকার। একটা স্ট্যান্ডার্ড ফুল-ফ্রেম মিররলেস ক্যামেরার সেন্সর আইফোন ১৮ প্রো-এর প্রধান সেন্সরের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বড়।
ক্যামেরার বিশাল আকারের এই সেন্সরগুলো ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা ন্যাচারাল ও দারুণ ব্লার তৈরি করে, যা কোনো সফটওয়্যার নিখুঁতভাবে নকল করতে পারে না। এগুলো প্রচুর পরিমাণে আলো টেনে নিতে পারে, যার ফলে কম আলোতেও ছবিতে কোনো নয়েজ থাকে না।
অ্যাপল তার ছোট সেন্সরের সীমাবদ্ধতা দূর করতে কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফির সাহায্য নেয়। একের পর এক ফ্রেম যোগ করে আর এক্সপোজার নিয়ন্ত্রণ করতে নতুন ফিজিক্যাল আইরিস ব্যবহার করে একটা দারুণ ডাইনামিক রেঞ্জ দিতে পারে। তবে খুব খুঁটিয়ে দেখলে চুল বা গাছের পাতার মতো সূক্ষ্ম জিনিসের ছবি তোলার সময়ে অতিরিক্ত ডিজিটাল শার্পনিংয়ের কারণে কিছুটা কৃত্রিম ভাব চোখে পড়ে।
লেন্সের ব্যবহার ও জুম করার ক্ষমতা
আইফোন ১৮ প্রো-তে রয়েছে তিনটি শক্তিশালী লেন্সের কম্বিনেশন—যার প্রতিটাতেই ৪৮ মেগাপিক্সেল সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আল্ট্রা-ওয়াইড, স্ট্যান্ডার্ড এবং টেলিফোটো ছবি তুলতে পারে।
তবে একটা মিররলেস সিস্টেম কাজ করে ইন্টারচেঞ্জেবল লেন্স মাউন্টের ওপর ভিত্তি করে। ফটোগ্রাফাররা চাইলেই পোর্ট্রেট প্রাইম লেন্স থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার জন্য বিশাল টেলিফোটো লেন্সও এতে লাগাতে পারেন।
আরও পড়ুন: আইওএস ২৭-এ বড় নিরাপত্তা ফিচার, প্রতারণার সময় সতর্ক করবে আইফোন
মিররলেস ক্যামেরায় লেন্সের ভেতরের ফিজিক্যাল গ্লাস এলিমেন্টগুলো নড়াচড়া করে জুম করে। এর ফলে ছবির কোয়ালিটি পুরোপুরি পারফেক্ট হয়। কিন্তু আইফোনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তিনটি লেন্সের মাঝের কোনো ফোকাল লেন্থে জুম করতে হলে ডিজিটাল ক্রপিং আর সফটওয়্যারের ওপর ভরসা করতে হয়।
স্থায়িত্ব বনাম বহনযোগ্যতা
কোনটা বেশি নির্ভরযোগ্য? পেশাদারদের কাছে একটা ক্যামেরা হলো দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করার একটা হাতিয়ার। মিররলেস ক্যামেরায় রয়েছে ডেডিকেটেড ফিজিক্যাল ডায়াল, সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকআপ নেওয়ার জন্য দুটো মেমোরি কার্ড স্লট আর আনলিমিটেড ব্যাটারি বদলে নেওয়ার সুবিধা। এগুলি আনকমপ্রেসড র ফাইল শুট করে, যা এডিটিংয়ের সময়ে কালার গ্রেডিং ও এক্সপোজার ঠিক করার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়।
পাশাপাশি, আইফোন ১৮ প্রো অত্যন্ত দ্রুত ও সহজে ব্যবহার করা যায়। এটি হাই-এন্ড ভিডিওর জন্য অ্যাপল লগ সাপোর্ট করে, এর নতুন অ্যাপারচার সিস্টেমের জন্য রয়েছে ম্যানুয়াল কন্ট্রোল এবং এটি সরাসরি জিন্সের পকেটে ফিট হয়ে যায়। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য এটি একটা দারুণ ডিভাইস, যা দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটে একটা হাই-কোয়ালিটি ভিডিও শুট, এডিট এবং ইন্টারনেটে পাবলিশ করা সম্ভব।
তাই এ কথা বলা যেতেই পারে যে, আইফোন ১৮ প্রো আগের মিররলেস ক্যামেরার সঙ্গে তফাতকে অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। সাধারণ ছবি তোলা, ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখা আর সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুত কনটেন্ট তৈরির জন্য এই ফোনটি একাই একশো, যা ভবিষ্যতে ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফির ক্ষেত্রে অবশ্যই একটা বড় বদল আনবে। তবে গ্যালারি প্রিন্ট, কমার্শিয়াল কাজ আর কম আলোর চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে ফটো তোলার ক্ষেত্রে এখনও মিররলেস ক্যামেরার জুড়ি মেলা ভার।
এজেড




