শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

হাইটেক পার্কে বিপুল বিনিয়োগেও মিলছে না প্রত্যাশিত সুফল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

হাইটেক পার্কে বিপুল বিনিয়োগেও মিলছে না প্রত্যাশিত সুফল
আওয়ামী লীগ আমলে নির্মিত একটি হাইটেক পার্ক। ছবি: সংগৃহীত

দেশে একের পর এক হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ এবং ক্রমবর্ধমান বাজেট বরাদ্দের পরও প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। অবকাঠামো নির্মাণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও দক্ষ জনবল, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ, প্রশিক্ষণ ও কার্যকর ব্যবসায়িক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় হাইটেক পার্কগুলোর লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘আজকের অ্যাজেন্ডা’ ভার্চুয়াল সিরিজের সর্বশেষ পর্বে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ‘হাইটেক পার্কস: মিশন কী? বাস্তবতা কী?’ শীর্ষক আলোচনায় শিল্প নেতৃবৃন্দ, সাবেক কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকরা দেশের হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি এবং সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

আলোচনায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. রকনুজ্জামান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ৩৯টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তুলেছে। ধারণাটি ছিল, অবকাঠামো তৈরি করলেই হাইটেক বিপ্লব ও বিনিয়োগ আসবে। কিন্তু সহায়ক ইকোসিস্টেম, দক্ষ জনবল এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

তার মতে, এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, এই ধারণা সঠিক ছিল না। তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতাও এর বিপরীত চিত্র তুলে ধরে।

যশোর হাইটেক পার্কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন ওই অংশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত এ পার্কে বর্তমানে ৪০টি কোম্পানি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কার্যকর ইকোসিস্টেম সহায়তা ছাড়াই কোম্পানিগুলোকে নিজেদের মতো করে টিকে থাকার চেষ্টা করতে হচ্ছে।

তার অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ কোম্পানিগুলোকে উদ্যোক্তা হিসেবে না দেখে শুধু ভাড়াটে হিসেবে বিবেচনা করে। এর পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল দ্রুত চলে যাওয়া, স্থাপনার দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং বেশি ইউটিলিটি খরচও পার্কটির অন্যতম সমস্যা।

আরও পড়ুন

অনলাইন ব্যবসার আড়ালে ২ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি, অভিযানে আলফা ই-শপ

তবে রাজশাহী হাইটেক পার্কের অভিজ্ঞতায় কিছুটা আশার চিত্র তুলে ধরেন নেট্রো সিস্টেমস লিমিটেড ও টেলজেনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. আশাফুদ্দোজা শিশির। তিনি বলেন, প্রযুক্তি উদ্যোগের ক্ষেত্রে রাজশাহী তুলনামূলকভাবে এগিয়ে যাওয়ার একটি বিরল উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালের একটি ইনকিউবেশন সেন্টার থেকে শুরু হওয়া রাজশাহীর প্রযুক্তি উদ্যোগগুলো এরই মধ্যে বৈশ্বিক পরিসরে পৌঁছেছে। তবে হাইটেক পার্কে কোম্পানিগুলোর জন্য প্রকৃত সুবিধা এখনো মূলত কর অব্যাহতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। স্টার্টআপগুলোর জন্য কর্তৃপক্ষের সরাসরি সহায়তা প্রায় অনুপস্থিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেডের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা এ. রহমান বলেন, হাইটেক পার্ক নিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতির একটি অন্তহীন চক্র তৈরি হয়েছে। দেশজুড়ে এত পার্ক নির্মাণ হলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

Hi-Teck
ভার্চুয়াল বৈঠকে যুক্ত অতিথিরা। ছবি: সংগৃহীত

বেসিসের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে জমির প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও সহায়ক সেবা না থাকায় পরবর্তী সময়ে অনেকেই তাদের বরাদ্দ ফিরিয়ে দিয়েছেন।

ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফেল কবির হাইটেক পার্কগুলোর পরিকল্পনা ও সরকারি নীতির মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উবার ও ফুডপান্ডার ক্ষেত্রে সরকারের নমনীয় নিয়ন্ত্রক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে হাইটেক পার্কগুলোর পরিকল্পনার তুলনা করেন।

আরও পড়ুন

কৌশলে শুল্ক ফাঁকি: ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের আড়ালে ৪ বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি

তিনি বলেন, শুধু রফতানি কর প্রণোদনার ওপর নির্ভর না করে হাইটেক পার্কগুলোর লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল মাদারবোর্ড ও চিপ ফ্যাব্রিকেশনের মতো মৌলিক প্রযুক্তি উৎপাদন। একই সঙ্গে ইপিজেডের মানসম্পন্ন অবকাঠামো নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফয়েজ আহমেদ তাইয়েব হাইটেক পার্ক স্থাপনের স্থান নির্বাচনের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান ইপিজেড বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত না করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এলাকায় পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের হাইটেক পার্কগুলোর মূল ব্যর্থতা হলো এমন অঞ্চলে ভারী ভৌত অবকাঠামো স্থাপন করা, যেখানে কার্যকর স্থানীয় অর্থনীতি নেই।

সমস্যাটি শুধু অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে তিনি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাবেক এই বিশেষ সহকারী।

আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য শুধু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের দিকে মনোযোগ না দিয়ে সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শিল্পচালিত প্রশিক্ষণ গড়ে তুলতে হবে।

আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তাদের অভিন্ন মত হলো, বাংলাদেশের হাইটেক পার্কের মডেল পুরোপুরি পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রকৃত ইউটিলিটি সুবিধা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে মডেলটিকে নতুন করে সাজাতে হবে।

কোম্পানিগুলোকে শুধু ভাড়াটে হিসেবে নয়, বরং অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে হাইটেক পার্কগুলো দেশের প্রযুক্তি খাত ও বিনিয়োগে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আলোচনায় মত দেওয়া হয়।

এমএইচ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর