আধুনিক সভ্যতায় মোবাইল ফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যোগাযোগ থেকে শুরু করে অফিসের কাজ, সবকিছুর জন্যই আমরা নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই নেটওয়ার্ক নিশ্চিতকারী মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিনের এক ভীতি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, টাওয়ার থেকে নির্গত তরঙ্গ ক্যানসার বা নানা শারীরিক সমস্যার কারণ। বিজ্ঞানের আলোকে এই ভীতি কতটা যৌক্তিক, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।
আরও পড়ুন: ফোনের এক প্রান্তের কথা শত কিলোমিটার দূরে অপর প্রান্তে কীভাবে পৌঁছায়?
বিজ্ঞাপন
রেডিয়েশনের ধরন ও বিজ্ঞান
বিজ্ঞানের ভাষায় রেডিয়েশন মূলত দুই প্রকারের হয়। প্রথমটি হলো আয়োনাইজড রেডিয়েশন, যার মধ্যে অতিবেগুনি রশ্মি, গামা রশ্মি এবং এক্স-রে অন্তর্ভুক্ত। এগুলো মানবদেহের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম। অন্যদিকে, মোবাইল ফোন, মোবাইল টাওয়ার বা ওয়াইফাই রাউটারে ব্যবহৃত তরঙ্গ হলো নন-আয়োনাইজড রেডিয়েশন। এই তরঙ্গের শক্তি অত্যন্ত কম, যা কোষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। ফলে মোবাইল টাওয়ারের তরঙ্গকে ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও বিটিআরসির অবস্থান
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি নিয়মিতভাবে দেশজুড়ে টাওয়ারের রেডিয়েশনের মাত্রা পরিবীক্ষণ করে থাকে। প্রতিটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, টাওয়ার থেকে নির্গত রেডিয়েশনের পরিমাণ নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার অনেক নিচে থাকে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে যে প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়, বাংলাদেশেও ঠিক একই মানের ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করা হয়, যা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
ভ্রান্ত ধারণা ও নেটওয়ার্ক সংকট
অহেতুক ভীতি থেকে অনেকেই মোবাইল টাওয়ার স্থাপনে বাধা দেন বা বাসা-বাড়ির ছাদে টাওয়ার বসাতে আপত্তি জানান। এই কাল্পনিক ভীতি আমাদের সামগ্রিক টেলিকম অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জরুরি নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ আটকে আছে। একদিকে আমরা উচ্চগতির ইন্টারনেট ও নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল সেবা প্রত্যাশা করি, অন্যদিকে টাওয়ার বসাতে দিচ্ছি না। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গ্রাহক নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং কলের গুণমান ব্যাহত হচ্ছে।

অবৈধ যন্ত্রপাতির ঝুঁকি
রেডিয়েশন নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ না থাকলেও, কিছু অবৈধ চর্চা সত্যিই উদ্বেগের। অনেকে নেটওয়ার্ক সমস্যা সমাধানের আশায় অবৈধভাবে জ্যামার, রিপিটার বা বুস্টার ব্যবহার করেন। এ ধরনের সরঞ্জামগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের এবং এগুলো থেকে অনিয়ন্ত্রিত তরঙ্গ নির্গত হয়, যা নেটওয়ার্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। এই যন্ত্রগুলোই মূলত স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং এগুলো স্থাপন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
সচেতনতাই সমাধান
মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন যে ক্ষতিকর নয়, তা আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে সঠিক অবকাঠামোর প্রয়োজন। তাই অমূলক ভীতি কাটিয়ে উঠে সচেতনতা তৈরি করাই এখন সময়ের দাবি। নির্ভরযোগ্য সেবা পেতে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে আমাদের প্রত্যেকেরই টেলিকম অবকাঠামো বিস্তারে সহযোগিতা করা উচিত।
এজেড




