রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ইসরায়েলের ‘গসপেল’ এআই: সেকেন্ডেই নির্ধারণ করছে কোথায় পড়বে বোমা

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম

শেয়ার করুন:

ইসরায়েলের ‘গসপেল’ এআই: সেকেন্ডেই নির্ধারণ করছে কোথায় পড়বে বোমা
ইসরায়েলের ‘গসপেল’ এআই: সেকেন্ডেই নির্ধারণ করছে কোথায় পড়বে বোমা

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর শুধু কামান কিংবা ট্যাংকের গোলার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতায় যুদ্ধ এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কম্পিউটার রুমের জটিল সব কোড আর অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোথায় পড়বে বোমা, আর কে হবে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত এমনই এক সংহারক প্রযুক্তির নাম ‘গসপেল’ বা ‘হাবসোরা’। যা চোখের পলকে হাজার হাজার তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নির্ভুল লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করতে সক্ষম।

গসপেল আসলে কী?


বিজ্ঞাপন


‘গসপেল’ হলো ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা শাখা ‘ইউনিট ৮২০০’-এর তৈরি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এআই-ভিত্তিক সিস্টেম। এটি মূলত একটি বিশাল ডেটা প্রসেসিং প্ল্যান্টের মতো কাজ করে। স্যাটেলাইট ইমেজ, ড্রোন ফুটেজ, মোবাইল কল রেকর্ড, ইন্টারনেট ট্রাফিক এবং গোয়েন্দা নথির মতো লাখ লাখ ডেটা এটি দিনরাত স্ক্যান করে। যেখানে মানুষের পক্ষে মাসের পর মাস গবেষণা করেও হয়তো ৫০টি লক্ষ্যবস্তু বের করা কঠিন, সেখানে গসপেল মাত্র ১০-১২ দিনে ২০০-এর বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে।

cca863432eab81687649f760ef232f86290e1320-1200x675

যেভাবে কাজ করে এই ‘টার্গেট ফ্যাক্টরি’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে এটি ‘টার্গেট ফ্যাক্টরি’ নামে পরিচিত। এর কাজের ধাপগুলো মূলত প্রযুক্তি নির্ভর-


বিজ্ঞাপন


ডেটা বিশ্লেষণ: ড্রোন ও স্যাটেলাইট থেকে আসা লাইভ ভিডিও এবং ইলেকট্রনিক সংকেত বিশ্লেষণ করে এটি সন্দেহভাজন বাড়ি, টানেল বা অস্ত্র গুদাম শনাক্ত করে।

ফায়ার ফ্যাক্টরির সমন্বয়: গসপেল যখন কোনো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে, তখন ‘ফায়ার ফ্যাক্টরি’ নামের আরেকটি সিস্টেম ঠিক করে দেয় কোন বিমান থেকে কত ওজনের বোমা ফেললে লক্ষ্যবস্তুটি ধ্বংস হবে।

Operation_Guardian_of_the_Walls_May_2021._XV

মানুষের চেয়ে ৫০ গুণ দ্রুত: মানুষের মস্তিস্কের তুলনায় এই সিস্টেম প্রায় ৫০ গুণ দ্রুত কাজ করে। দিনে প্রায় ১০০টি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্দেশ করার ক্ষমতা রাখে এই এআই।

গসপেল বনাম ল্যাভেন্ডার: পার্থক্য কোথায়?

ইসরায়েলি প্রযুক্তিতে গসপেল এবং ল্যাভেন্ডার—এই দুটি সিস্টেম একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। গসপেল মূলত ভৌত অবকাঠামো যেমন—ভবন, অফিস বা গোপন আস্তানা খুঁজে বের করে। অন্যদিকে ‘ল্যাভেন্ডার’ সিস্টেমটি কাজ করে মানুষের ওপর। এটি গাজার লাখ লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে ১ থেকে ১০০-এর মধ্যে একটি স্কোর দেয়। যাদের স্কোর বেশি থাকে, এআই তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। সহজ কথায়, গসপেল ঠিক করে কোথায় বোমা পড়বে, আর ল্যাভেন্ডার ঠিক করে কার ওপর পড়বে।

LGRN26PM43H272WFKIR3FIIWP4

ক্রমবর্ধমান বিতর্ক ও ঝুঁকি

প্রযুক্তির এই জয়জয়কারের আড়ালে চরম মানবিক ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে-

১. ভুলের সম্ভাবনা: এআই কেবল ডেটা দেখে, আবেগ নয়। কোনো নিরীহ মানুষের ফোন যদি ভুলবশত কোনো সন্দেহভাজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তবে এআই তাকেও লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ফেলে দেয়।


২. বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি: ড্রোন ইমেজে ভবনটি সামরিক মনে হলেও তার পাশে শিশু বা হাসপাতাল আছে কি না, তা অনেক সময় মেশিন বুঝতে ব্যর্থ হয়।

আরও পড়ুন: ব্লু স্প্যারো: খামেনি হত্যায় ব্যবহৃত পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মিসাইল

৩. জবাবদিহিতার অভাব: এআই-এর ভুলে নিরপরাধ মানুষ মারা গেলে তার দায়ভার কে নেবে—সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নাকি বোতাম টেপা সেনা কর্মকর্তা? তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করছে যে, প্রতিটি হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একজন মানুষই নিয়ে থাকেন। তবে সমালোচকদের মতে, প্রতি মিনিটে যখন কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তু তৈরি হয়, তখন একজন মানুষের পক্ষে প্রতিটি বিষয় সূক্ষ্মভাবে যাচাই করা কার্যত অসম্ভব। এই প্রযুক্তি যুদ্ধকে হয়তো আরও ‘দক্ষ’ করছে, কিন্তু যুদ্ধকে আরও বেশি নির্মম করে তোলার ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এজেড

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর