মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইসরায়েলের ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’ বা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। আর এই অভিযানে যমদূত হয়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছিল ইসরায়েলের তৈরি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ব্লু স্প্যারো’ (Blue Sparrow)। মহাকাশের প্রান্ত ছুঁয়ে খাড়াভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার অসামান্য ক্ষমতার কারণে একে বলা হচ্ছে ‘মহাকাশ থেকে আসা মিসাইল’।
ব্লু স্প্যারো কী ও কারা এটি বানিয়েছে?
বিজ্ঞাপন
ব্লু স্প্যারো হলো একটি এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল (ALBM)। সাধারণ ব্যালিস্টিক মিসাইল মাটি থেকে ছোড়া হলেও এটি যুদ্ধবিমান (যেমন: F-15 Eagle) থেকে নিক্ষেপ করা হয়। এটি তৈরি করেছে ইসরায়েলের খ্যাতনামা প্রতিরক্ষা সংস্থা রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস (Rafael Advanced Defense Systems)। মূলত ইসরায়েলের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘অ্যারো’ (Arrow) পরীক্ষার জন্য এটি তৈরি করা হলেও পরে একে বিধ্বংসী মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত করা হয়।

কেন এটি এত বিধ্বংসী? (প্রযুক্তি ও কৌশল)
এই মিসাইলটি পৃথিবীর অন্য যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র থেকে আলাদা হওয়ার পেছনে কয়েকটি বিশেষ কারণ রয়েছে:
বিজ্ঞাপন
মহাকাশ ভ্রমণ ও রি-এন্ট্রি: নিক্ষেপের পর এটি বায়ুমণ্ডলের একেবারে শেষ প্রান্তে (Edge of space) চলে যায়। সেখান থেকে এর ‘রি-এন্ট্রি ভেহিকল’ বা সামনের অংশটি আলাদা হয়ে প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে খাড়াভাবে মাটির দিকে নেমে আসে।
আরও পড়ুন: টর্পেডো কী, এটি কী কাজে লাগে?
দুর্ভেদ্য গতি: মহাকাশ থেকে নিচে নামার সময় এটি শব্দের গতির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতি (Hypersonic speed) প্রাপ্ত হয়।
শনাক্ত করা অসম্ভব: অধিকাংশ রাডার দিগন্তের দিক থেকে আসা মিসাইল ধরতে পারে। কিন্তু ব্লু স্প্যারো ঠিক মাথার ওপর থেকে সরাসরি নিচে পড়ে বলে শত্রু দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে শনাক্ত বা ধ্বংস করার সময় পায় না।
নির্ভুল লক্ষ্যভেদ: এতে জিপিএস (GPS) এবং আইএনএস (INS) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে ছোড়া হলেও এটি লক্ষ্যবস্তুর মাত্র ৩ মিটারের মধ্যে আঘাত হানতে সক্ষম।

ক্ষয়ক্ষতি ও সামর্থ্য
আঘাতের ক্ষমতা: এই মিসাইলটি প্রায় ৫০০ কেজি পর্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এটি কেবল ওপরের ভবনই নয়, বরং মাটির গভীরে থাকা বাঙ্কার ধ্বংস করতেও সক্ষম।
পাল্লা: এটি প্রায় ১,২৪০ মাইল (২,০০০ কিমি) পথ পাড়ি দিতে পারে। খামেনি হত্যার সময় তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিটের বাসভবনে এর আঘাতে কয়েক ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে।
দাম ও ব্যবহারকারী দেশ
একটি ব্লু স্প্যারো মিসাইলের সঠিক দাম প্রতিরক্ষা গোপনীয়তার কারণে প্রকাশ করা না হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি মিসাইলের উৎপাদন ও পরিচালনা খরচ কয়েক মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে এই প্রযুক্তি এবং মিসাইলটি কেবলমাত্র ইসরায়েলের কাছেই রয়েছে। তবে এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘ROCKS’ মিসাইল নিয়ে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশই এখন আগ্রহী।
এজেড

