বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে বিশ্বকাপসহ ফিফার সব ধরনের প্রতিযোগিতা বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা (ইউইএফএ)। সংস্থাটির দাবি, বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্যতম বড় ঐতিহ্য। এটিকে কোনোভাবেই বাণিজ্যিক সম্পদ বা বেসরকারি মালিকানার আওতায় আনা উচিত নয়।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) উয়েফার ৫৫ সদস্য দেশের ফুটবল ফেডারেশনের জরুরি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে উয়েফা জানায়, ফিফা যদি বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা থেকে সরে না আসে এবং ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ আর না নেওয়ার নিশ্চয়তা না দেয়, তাহলে ইউরোপের জাতীয় দলগুলো ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।
সম্প্রতি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এ কাঠামোয় ২০ শতাংশ মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানের নামও আলোচনায় এসেছে।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের মালিকানা বিক্রি প্রসঙ্গে অবস্থান স্পষ্ট করলেন ফিফা সভাপতি
উয়েফার অভিযোগ, ফুটবলের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিকল্পনা জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন, মহাদেশীয় সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে কোনো অর্থবহ আলোচনা ছাড়াই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, বিশ্বকাপ বহু প্রজন্মের খেলোয়াড়, জাতীয় দল ও সমর্থকদের সম্মিলিত অবদানে গড়ে ওঠা বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আয়োজন। এর কোনো অংশই বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা মালিকানার অংশীদার হলে ফুটবলের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তে খেলার স্বার্থের পরিবর্তে আর্থিক মুনাফার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। তখন আন্তর্জাতিক ম্যাচ সূচি, প্রতিযোগিতার কাঠামো এবং বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। উয়েফার মতে, এমন ব্যবসায়িক মডেলের কোনো স্থান বিশ্ব ফুটবলে নেই এবং স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের জন্য ফুটবলের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখা যায় না।
সমালোচনার মুখে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, বিষয়টি এখনো একটি প্রস্তাব, কোনো বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নয়। তবে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফাও এ পরিকল্পনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ না করা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি বিদ্যমান ফুটবল কাঠামোর প্রতি অবহেলার শামিল।
আরও পড়ুন: যে ভুল সিদ্ধান্তে শেষ হয় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ, অবশেষে জানালেন আনচেলত্তি
ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটারও এ পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেছেন। তার ভাষায়, ফুটবল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়, এটি বিশ্বের মানুষের খেলা। একইভাবে যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা ন্যান্ডিও উয়েফার অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, ফুটবল সমর্থকদের, কোনো ধনী বিনিয়োগকারীর নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মালিকানা নিয়ে এই বিরোধ ফিফার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী বছরের মার্চে মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা সভাপতি নির্বাচনের আগে এ বিতর্ক জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উয়েফার মতো প্রভাবশালী মহাদেশীয় সংস্থার প্রকাশ্য বিরোধিতা আন্তর্জাতিক ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা




